36 C
Dhaka
Saturday, January 23, 2021
No menu items!

সত্য উদ্ঘাটন করাই সাংবাদিকদের কাজ !

বিভুরঞ্জন সরকার

বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে কি-না সেটা কিছুটা বিতর্কিত বিষয়। কেউ মনে করেন দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই, আবার কেউ মনে করেন আছে। তবে সরকার পক্ষ তাদের সমালোচনা পছন্দ করে না – এটা ঠিক। শুধু বর্তমান সরকারের আমলেই গণমাধ্যমের ওপর বা স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর অসহিষ্ণুতা দেখানো হচ্ছে ব্যাপারটা তেমনও নয়। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বঙ্গবন্ধুর আমল ছাড়া আর সব আমলেই হয়েছে। তবে আমরা যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সেই সরকারকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণকারী বলে মনে করে থাকি। কারণ বর্তমানটা আমাদের কাছে যতোটা জ্বলজ্বলে, অতীতটা ততেটাই ধুসর।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক বিবৃতিতে সরকার সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন করছে বলে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘সত্য উদ্ঘাটন করাই তো সাংবাদিকদের কাজ’। কোনো সন্দেহ নেই, সত্য উদ্ঘাটন করাই সাংবাদিকদের কাজ। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন কি এটা মির্জা সাহেবদের মনে ছিল? বিএনপি আমলে কি দেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন কম হয়েছে? বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে হত্যাও করা হয়েছে। হুমায়ুন কবির বালু, মানিক সাহা, শামসুর রহমান, দীপঙ্কর চক্রবর্তী খুন হয়েছিলেন কোন আমলে? কোনো হত্যাকাণ্ডের কি সঠিক তদন্ত ও বিচার হয়েছে? আমাদের দেশে ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনীতিবিদরা যা বলেন ক্ষমতায় গিয়ে তার বিপরীতটা করেন। রাজনীতির এই বৈপরীত্য সমাজের অন্য ক্ষেত্রগুলোকেও প্রভাবিত করে থাকে। গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতাও রাজনীতির ‘মন্দ’ হাওয়া থেকে মুক্ত নেই। মুক্ত থাকার বাস্তব কারণও নেই।

আগেও বলেছি, আবারও বলছি, সমাজের অন্য শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে যেমন দুর্নীতি-অসততা আছে, তেমনি সাংবাদিকদের মধ্যেও আছে। তবে এরমধ্যে মাত্রা ভেদ আছে। অন্য পেশার তুলনায় সাংবাদিকদের মধ্যে দুর্নীতি ও অসততা কম বলেই আমার ধারণা। কোনো সাংবাদিকর পুকুরচুরি, সাগরচুরির সুযোগ নেই। সাংবাদিকদের কেউ কেউ কিছু ‘ধান্ধা’ করেন না , তা আমি জোর দিয়ে দাবি করবো না। ধান্ধাবাজ সাংবাদিকের সংখ্যা কম। স্বল্প বেতন এবং অনিয়মিত বেতনের কারণে সাংবাদিকদের কেউ হয়তো কারো কাছে কিছু সুযোগ-সুবিধা নিয়ে থাকতে পারেন। তাতে অন্যের কোনো ক্ষতির কারণ ঘটে বলে মনে হয় না।

ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৮৬ সালে আমি কমিউনিস্ট পার্টির সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘একতা’য় কাজ করতাম। মাসিক বেতন আটশ টাকা। সেসময় আমি বিয়ে করলাম। বিয়ে করার কারণে ( যেহেতু স্ত্রী চাকরি করতো না ) বেতন বেড়ে হলো বারোশ টাকা। একটি কমিউনিস্ট পরিবারের সঙ্গে সাবলেট থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম। থাকা-খাওয়া বাবদ তাদের দিতে হতো দুই হাজার টাকা। অন্য খরচ-খরচা যদি বাদও দেওয়া হয়, তাহলেও আমার বেতনের চেয়ে থাকা-খাওয়ার ব্যয় আটশ টাকা বেশি। নতুন বিয়ে। কীভাবে ব্যয় নির্বাহ করেছি? সাপ্তাহিক যায়যায়দিন-এ আমি একটি লেখা দিতাম। প্রতি লেখার জন্য পেতাম পাঁচশ টাকা। মাসে চারটি লেখা দুই হাজার টাকা। লেখার সম্মানী পরিশোধে সম্পাদক শফিক রেহমান ছিলেন খুবই উদার।মাস শেষ হতে না হতেই চেক! যায়যায়দিন বন্ধ হওয়ার পর আমি রাত জেগে বইয়ের প্রুফ দেখে আয় বাড়ানোর চেষ্টাও করেছি।
কিন্তু তাসত্ত্বেও পার্টি নেতাদের দুএকজন বলেছেন, আমি গাছেরটাও খাচ্ছি, তলারটাও কুড়াচ্ছি।

এখন তো অবস্থা আরো ভয়াবহ। লিখে নিয়মিত টাকা পান কয়জন তা আমি জানি না। আমি যে পাই না সেটা বলতে পারি। একটি পত্রিকা আমাকে মাসের সম্মানী মাসে পরিশোধ করে। সেটা কোনো বড় অংকের টাকা নয়। অন্য কেউই মাসের টাকা মাসে দেয় না। কখনো কখনো তিন মাস/ ছয় মাসও দেরি হয়। একটি পুরনো দৈনিকে নিয়মিত লিখতাম। কিন্তু মাসের পর মাস সম্মানী না দেওয়ায় এখন আর লেখা দেই না। আমারই যখন এই অবস্থা, অন্যদের অবস্থা এ থেকে আন্দাজ করতে পারি।

আমাদের দেশে গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের এক ধরনের ‘ধান্ধা’র জীবন বেছে নিতে বাধ্য করেন। ঢাকার সাংবাদিকদের থেকে মফস্বলের সাংবাদিকদের জীবন আরো দুর্বিষহ। বেশির ভাগ মফস্বল সাংবাদিক একটি নিয়োগপত্র এবং পরিচয়পত্র ছাড়া আর কিছু পান না। কোনো কোনো পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল কিছু মাসোহারা দিলেও তা অতি সামান্য এবং অনিয়মিত। তাহলে মফস্বল সাংবাদিকের জীবন চলে কীভাবে? নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো যায় কিন্তু নিজের খাওয়াটা তো থাকতে হবে!

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে যারা সাংবাদিকদের কাছে সততা আশা করেন তারা আসলে কল্পজগতের বাসিন্দা। কিছু ‘তারকা’ সাংবাদিকের আয়-উপার্জন বা জীবন যাপন দেখে যারা মনে করেন সাংবাদিকদের আর সমস্যা কি – তারা বাস্তবটা জানেন না, জানার চেষ্টাও করেন না।

সাংবাদিকদের সত্য সন্ধানের তাগিদ অহরহ দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, কোন সত্য সন্ধান করবেন একজন সাংবাদিক। ব্যক্তি সাংবাদিকের কি আলাদা কোনো অস্তিত্ব আছে? আমি যদি অনুসন্ধানী একটি প্রতিবেদন তৈরি করি সেটা প্রচার বা প্রকাশের ক্ষমতা তো আমার নেই। সেটা তো মালিক বা সম্পাদকের হাতে। তার ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে আমার প্রতিবেদন সাংঘর্ষিক হলে সেটা তো কোনো দিন আলোর মুখ দেখবে না।

এক সময় ধনিক গোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনী প্রকাশ করে পাঠকপ্রিয় হয়েছিল সাপ্তাহিক একতা। এখন কি কোনো গণমাধ্যম ধনিক গোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনী ধরাবাহিকভাবে প্রকাশ করবে? আমাদের দেশে ধনিক গোষ্ঠী তো গড়েই উঠেছে লুটপাটের মাধ্যমে। লুটেরা পুঁজির মালিকরাই তো এখন দেশের রাজনীতি ও গণমাধ্যমের নিয়ন্তা। গণমাধ্যমের মালিকানা এবং পরিচালনার হাত বদল না হলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা একটি অলীক কল্পনা হয়েই থাকবে। আর সাংবাদিকদের বেঁচে থাকার মতো বেতন-ভাতা নিশ্চিত না করে তাদের কাছে সৎ সাংবাদিকতা আশা করাও দুরাশা। কারণ এখন ‘সেই সত্য রচিবে যা তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো’।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই – এই কথা বলা হচ্ছে এবং তা গণমাধ্যমে তা প্রচার ও প্রকাশ হচ্ছে। কী এমন কথা, কার মনে আছে যা তিনি বলতে পারছেন না? হ্যাঁ, কিছু মামলা-গ্রেপ্তারের মতো নিন্দনীয় ঘটনা ঘটছে, কারো কারো মধ্যে কিছু অসহিষ্ণুতা দেখা যাচ্ছে। এটা সেই ‘রাজা যতো বলে পারিষদ দলে, বলে তার শতগুণ’-এর মতো নয় তো? ধরে আনতে বললে বেঁধে আনার ঘটনা অনেক সময়ই ঘটে। তবে নির্যাতন-নিবর্তনের একটি ঘটনাও সমর্থনযোগ্য নয়। তুচ্ছ কারণে জেলজুমুমের শিকার হতে হলে সেটা মানা যায় না। পেছন দিয়ে হাতি চলে যাবে, আর সামনে সুই দেখলে হৃদকম্প হওয়াটা ভালো লক্ষণ নয়। সরকারে থাকলে সমালোচনা সহ্য করার মানসিক শক্তিও থাকতে হবে। হঠাৎ হঠাৎ মাথা গরম করা ঠিক না।
এই আলোচনাটা আরেকটু চালানোর আশা রাখি।—(চলবে)

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সর্বশেষ

উদ্বোধনের অপেক্ষায় বাগেরহাটে ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত ৪৩৩ ঘর

বাগেরহাট প্রতিনিধি : মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে বাগেরহাটে ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত ৪৩৩টি ঘর উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের...

৭ বছরের শিশু ধর্ষণের অভিযোগে যুবকের বিরুদ্ধে মামলা

বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাগেরহাটে সাত বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে এনাম শেখ (২২) নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ জানুয়ারি)...

শরণখোলা ছাত্রলীগে বিভক্তি সংবাদ সম্মেলনে কমিটি থেকে বাদ পড়া নেতারা

বাগেরহাট প্রতিনিধি: তিন বছর পর হঠাৎ করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণায় দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে শরণখোলা উপজেলা ছাত্রলীগ। জেলা কমিটি থেকে এক সংবাদ...

বাগেরহাটে সরকারী রাস্তার গাঁছ বিক্রি করছে একটি চক্র

বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাগেরহাটের কচুয়ায় সরকারী রাস্তার পাশের গাঁছ কেটে বিক্রি করছে গাছ খোকো একটি চক্র। কিছু অসাধূ ব্যাক্তির সাথে গোপনে আতাঁত করে...

বাগেরহাটে মাছের খামারে ঘুরে দাড়িয়েছে বনানীর সংসার

বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাগেরহাটের চিতলমারীতে ‘আমার বাড়ি, আমার খামার’ প্রকল্পে’র ক্ষুদ্র ঋণ দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এ উপজেলার বেকার যুবক-যুবতী, গৃহিণী ও...