36 C
Dhaka
Tuesday, January 19, 2021
No menu items!

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের বকেয়া বেতন

বিভুরঞ্জন সরকার

গত ৭ এপ্রিল ঢাকায় নিযুক্ত পশ্চিমা সাতটি দেশ ও জোটের রাষ্ট্রদূতেরা এক টুইট বার্তায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কয়েকজন মানবাধিকার কর্মী , সাংবাদিক ও কার্টুনিস্টের বিরুদ্ধে মামলা করায় গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইডেন এবং নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূতদের টুইট বার্তার বক্তব্য প্রায় অভিন্ন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত আার্ল মিলার তার টুইটে লিখেছেন, ‘জনস্বার্থ সুরক্ষায় অবাধ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবভিত্তিক তথ্য প্রচারের সুযোগ থাকা দরকার।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা যেমন জরুরি তেমনি গণমাধ্যমকর্মীর কণ্ঠও যাতে রোধ করা না হয় সেটাও নিশ্চিত করতে হবে’। অন্যদের বক্তব্যও প্রায় একই বলে আর উদ্ধৃত করছি না। পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতদের এই বার্তা কারো কারো কাছে প্রশংসিত হবে। আবার তাদের এই নাক গলানো অপছন্দও করবেন অনেকে। সরকারও এটা পছন্দ করেনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীও পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতদের বক্তব্যকে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন। আমাদের দেশে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক আছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সব অবস্থায়, সব ক্ষেত্রে অবাধ কি-না আমি জানি না। ওসব দেশে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়নি।

আমার কাছে সেটা অনেকটা ‘না-দেখা ফুলের গোপন গন্ধ’-এর মতো। তবে স্পন্সরড সাংবাদিকতা যে ওসব দেশেও আছে তা কি মাঝে মাঝে শোনা যায় না?

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় ‘এমবেডেত সাংবাদিকতা’র কথা কি আমরা শুনিনি? তখন সামরিক বাহিনীর ছাড় করা সংবাদই মার্কিন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। যারা দুনিয়া জুড়ে রাজনৈতিক আধিপত্য জারি রাখতে চায় তারা সব সময় ‘বাস্তবভিত্তিক তথ্য প্রচার’ করতে সবাইকে সমানভাবে উৎসাহিত করে বলে অন্তত আমার মনে হয় না।

যে খবর তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধ যায়, সে খবর ‘কিল’ করার ভূরি ভূরি নজির আছে। আবার ভুয়া খবর পরিবেশন করে পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়ার নিন্দনীয় উদাহরণও আমাদের সামনে আছে। আমরা যে অনেক সময় নানা বিষয়ে পশ্চিমের দৃষ্টান্ত দেই, এটাও আমার কাছে খুব ভালো লাগে না। পশ্চিমের সমাজ, রাজনীতি, গণতান্ত্রিক চর্চা – কোনোটাই আমাদের মতো নয়। তবে হ্যা, ভালো জিনিস গ্রহণের মতো উদারতা অবশ্যই থাকা উচিত।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রই এখনো ভঙ্গুরতা কাটিয়ে শক্ত ভিত গাঁথতে পারেনি। আমাদের দেশে যারা উদার গণতন্ত্রের কথা বলেন, তারাও সর্বোতোভাবে সামন্ত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি।

ব্যক্তি জীবনে, পারিবারিকভাবে এবং নিজস্ব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বরদাশ করেন না, তারাই আবার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে হাহুতাশ করেন।

অনেকে হয়তো অখুশি হবেন, তারপরও আমি এটা মনে করি যে, বাংলাদেশে মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতার পরিবেশ এখন নেই। খুব সহসাই সেটা হবে বলেও আমি মনে করি না। গণমাধ্যমের মালিকানা এবং পরিচালনা যাদের হাতে, তারা কেউ নিজেদের স্বার্থের পরিমণ্ডলের বাইরে হাঁটতে চাইবেন না।

অনেকে মনে করেন, সরকারই বুঝি একমাত্র গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। একটা সময় পর্যন্ত হয়তো এটা ঠিক ছিল। সরকার যখন একা নিয়ন্ত্রক হয়, তখন সাংবাদিকরা সাহস ও সততার পরিচয় দিতে পারে।

তার প্রমাণ পাকিস্তানি আমল, এমন কি স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসন আমলেও গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকরা যে দৃঢতা দেখাতে পেরেছে, এখনকার বাস্তবতায় সেটা সম্ভব নয়।

এখন নিয়ন্ত্রণ দুই তরফে। একদিকে সরকার, অন্যদিকে মালিক পক্ষ। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা গেলেও মালিক বা মালিক নিয়োজিত সম্পাদকের নিষেধ অমান্য করা যায় না। সরকার মামলা দেয়, মালিক চাকরি খায়। সাংবাদিকদের কাছে সবাই সততা, সাহসিকতা, দৃঢতা আশা করেন।

দীর্ঘ পাঁচ দশকের সরাসরি সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাজার অর্থনীতি ও ভোগবাদী জীবনের যুগে কেবল সাংবাদিকদের কাছে উচ্চতর মূল্যবোধ আশা করা এক ধরনের হিপোক্রেসি ছাড়া আমার কাছে আর কিছু মনে হয় না।

জীবন-জীবিকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা না থাকলে সাহস বা সততা দেখানো খুব সহজ কাজ নয়। মাসের পর মাস বেতন বকেয়া থাকবে, যে সামান্য বেতন অনেক গণমাধ্যম থেকে দেওয়া হয় তাতে মাসের ঘর ভাড়াও হয় না । খেয়ে না-খেয়ে যে সাংবাদিকদের জীবন চলে তার পক্ষে কী করে সম্ভব সততার সঙ্গে পেশার মহত্ত্ব বজায় রাখা? বকেয়া বেতন আদায়ের দাবিতে আন্দোলন করবে না, ‘বস্তুনিষ্ঠ’ সংবাদের পেছনে ছুটবে?

বড়ো কথা বলা সহজ। বড়ো কাজ করা কঠিন। বিজ্ঞাপনদাতার স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো সংবাদ কি কোনো গণমাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করা যায় বা হয়?

একজন সাংবাদিক খেটেখুটে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করলেই কি তা প্রকাশ বা প্রচার হবে? সেটা তো কেবল সরকারি মহলের আপত্তির কারণে প্রকাশঅযোগ্য হবে না, মালিক-সম্পাদকেরও মনঃপূত হতে হবে। আর মালিক-সম্পাদকের মন কোন কোন ঘাটে বাধা, সেটা একজন সাংবাদিকের না-ও জানা থাকতে পারে!

আচ্ছা, মুক্ত সাংবাদিকতা মানেই কি সৎ সাংবাদিকতা? স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাড়ে তিন বছরের অভিজ্ঞতা কি বলে?

বাকশাল হওয়ার আগ পর্যন্ত তো সংবাদপত্রের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সেসময় হককথা, হলিডে, গণকন্ঠ ইত্যাদি পত্রিকাগুলো কি সৎ সাংবাদিকতা করেছে?

যা খুশি তা বলা বা লেখার নাম কি মতপ্রকাশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা? এনিয়ে আরো কথা বলার আছে—-।( চলবে)

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সর্বশেষ

জঙ্গিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে র‌্যাবের হটলাইন চালু

নিউজ ডেস্ক: জঙ্গিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে চালু হচ্ছে RAB এর হট লাইন। সোমবার ( ১৭ জানুয়ারি) র‌্যাবের পক্ষ থেকে এ তথ্য...

ভারতের উপহারের ২০ লাখ ডোজ টিকা আসছে ২০ জানুয়ারি

নিউজ ডেস্ক: আগামী বুধবার (২০ জানুয়ারি) ভারত থেকে ২০ লাখ টিকা বাংলাদেশে আসবে। অক্সর্ফোড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার এ টিকা ভারত সরকার বাংলাদেশকে উপহার দিচ্ছে। বিষয়টি...

আইনের শাসন সুসংহত করতে বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে

নিউজ ডেস্ক: সরকারি ও বিরোধী দল নির্বিশেষে জাতীয় সংসদে যথাযথ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি...

সংসদে যাদের নামে শোক প্রস্তাব আনা হলো

নিউজ ডেস্ক: জাতীয় সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে সাবেক একজন ডেপুটি স্পিকার, সাবেক একজন মন্ত্রী, সাবেক দুজন প্রতিমন্ত্রী, সাবেক নয়জন সংসদ সদস্যদের নামে শোক...

হাসানুল হক ইনু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত

নিউজ ডেস্ক: জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি এবং সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সোমবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে...