36 C
Dhaka
Wednesday, January 27, 2021
No menu items!

নৃশংস

আবু সাঈদ লীপু

রশীদ খুন হয়েছে।
খুনটা হয়েছে সালথায়। ফরিদপুর জেলার এই জনপদে খুনখারাবি নতুন কিছু না। সারা দেশে কত কত বিখ্যাত জায়গা আছে! আমের শহর রাজশাহী, দইয়ের শহর বগুড়া, শিক্ষিতের শহর বাউফল। অথচ সালথা খুনের জন্যই বিখ্যাত। আসলে কুখ্যাতই বলা উচিত। কতটুকুই বা হবে গায়-গতরে। ছোট্ট একটা উপজেলা মাত্র। অথচ মাস গেলেই খুন নিয়মিত। বছর গেলে গণনা দু’অঙ্কে যাবেই যাবে। রাজনীতি বড়ই সংঘাতপূর্ণ এখানে। দু’পক্ষই বেশ শক্তিশালী। বছরজুড়ে এদের সংঘাত লেগেই থাকে। জগতে ক্ষমতার মোহ ভয়ংকর সর্বনাশী। সবকালেই ছিল, এখনো আছে। একবার যিনি এই মোহতে আকৃষ্ট হয়েছেন তার আর নিস্তার নেই। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে সবাকিছুই করতে হয় তাকে। তবুও শেষ রক্ষা হয় না কখনোই। ক্ষমতা হাতবদল হতেই থাকে। পৃথিবীর এটাই নিয়ম।

ক্ষমতার লোভে এই সবকিছু করার মধ্যে খুনখারাবিও আছে। সালথা থানার বর্তমান ওসি নুরুল হাসান বিচলিত হন না মোটেও। খুনতো চলছেই। তিনি ঠেকাতে পারবেন না। তাছাড়া, এত খুনের তদন্ত করে সুষ্ঠু বিচার করার সামর্থ, লোকবল তার থানার নেই। তাই অনেক খুনই বিচারের বাইরে রয়ে যায়। কবে বিচার হয়ে দোষী শাস্তি পাবে তার হদিস কেউ জানে না। ওসি নুরুল হাসান নিজেই জানেন না। তবে রশীদের খুনটাতে নুরুল হাসান বিচলিত। বাচ্চা একটা ছেলে, বার-তের বছর হবে। এই ছেলেটাকে কে খুন করল? খুনের ধরণও নৃশংস। পুরো দেহ থেকে মাথা আলাদা করা।
‘নুরুজ্জামান, ঘটনাটা খুলে বলোতো?’ ওসি সাহেব চেয়ারে হেলান দিয়ে ফোনটা কানে ধরেন। নুরুল হাসানের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। এখনো মাথাভর্তি চুল। দু’একটা পাক ধরেছে তবে বেশীর ভাগই কুচকুচে কালো। নিখুঁত করে দাড়ি-গোঁফ কামানো। গায়ের রঙ ফরসা। শরীর স্বাস্থ্য বেশ ভাল। দেখতে সুপুরুষই লাগে। নিম্নপদ থেকে প্রোমোশন পেয়ে ওসি হয়েছেন বছর পাঁচেক হলো। অভিজ্ঞতায় ভরপুর ভদ্রলোক। পুলিশের চাকরিটা তিনি ভালই বুঝেন। কাকে ধরতে হবে, কাকে ছাড়তে হবে- নিখুঁত বলতে পারেন তিনি। পরিস্থিতির চাপ সামলে চাকরিটাকে ভালভাবে টিকিয়ে রাখতে তার জুড়ি মেলা ভার।

নুরুল হাসানকে সৎ বলা যাবে না কোনভাবেই। তবে নিন্দুকেরাও যে তাকে অন্যান্য পুলিশের মত কসাই বলবেন, তা কিন্তু না। রয়ে সয়ে হজম করেন তিনি। তাছাড়া, কী যেন একটা আছে ভদ্রলোকের মধ্যে। যার ফলে তিনি ঘুষখোরদের থেকে আলাদা। আবার ঠিক পরিপিূর্ণ ভালো মানুষও না। মেজাজটা সবসময় তিরিক্ষি থাকে। অথচ এলাকার লোকজন তাকে অপছন্দ করে না। বরঞ্চ পছন্দই করে, বেশ আন্তরিকভাবেই করে। পুলিশের প্রতি সাধারণের যে নেতিবাচক ধারণা, তা নুরুল হাসানের উপর খুব একটা বর্ষিত হয় না। তিনি এর উর্ধ্বে। কীভাবে তিনি সকলকে ম্যানেজ করেন? এটা রহস্যই আসলে।

‘স্যার, ঘটনা বিস্তারিত।’ সাব-ইনসপেক্টর নুরুজ্জামান শুরু করেন প্রথম থেকে।
‘সমস্যা নাই, নুরুজ্জামান। তুমি বিস্তারিতই বল। আমি শুনছি।’ ওসি সাহেব জানেন নুরুজ্জামান সংক্ষেপে কথা বলতে পারে না। তিনি বিরক্ত না, পুরোটাই শুনতে চাচ্ছেন।
‘স্যার, রশীদকে দুই দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছিল না। ওর বাবা-মা এখানে-ওখানে খোঁজে, কিন্তু রশীদ কোথাও নেই।’
‘বয়স কত বুঝলে?’
‘স্যার দশ-বারো হবে।’
‘তারপর?’
‘আজকে জঙ্গলের দিক থেকে পঁচা লাশের গন্ধ আসায় সকলে ওখানে গিয়ে লাশটা পেয়েছে। কে বা কারা রশীদকে খুন করে জঙ্গলে পুতে রেখেছিল। শেয়াল গর্ত করে লাশ বের করেছে। তারই গন্ধে গ্রামের লোকজন লাশ খুঁজে পায়।’ এতটুকু বলেই নুরুজ্জামান হাঁপিয়ে যায়। দম নেবার জন্য থামে একটু।
‘লাশের অবস্থা বলো?’ নুরুল হাসান তাড়া দেয়।
‘স্যার, গর্ত থেকে লাশ বের করা হয়েছে। শরীর থেকে মাথা আলাদা করা। শরীরে আর কোন আঘাতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।’
‘কেন খুন হলো তার কোন হদিস পেয়েছো?’
‘জ্বী না স্যার। কেউ কিছু জানে না। মনে হচ্ছে ভুত এসে খুন করে জঙ্গলে পুতে রেখেছে। এলাকার লোকজন তাই বলাবলি করছে।’
ভুত-প্রেতে নুরুল হাসানের বিশ্বাস নেই। তাদের খেয়ে-দেয়ে কাজও নেই যে রশীদের মত একটা বাচ্চা ছেলেকে শুধু শুধু খুন করবে। খুন করে আবার জঙ্গলেও পুতে রাখবে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস বের হয় তার, ‘তদন্ত করে দেখতে হবে।’
‘লাশটা যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দাও। কেউ যেন কিছু না ছোঁয়। আমি এখনই আসছি।’ নুরুল হাসান এক ধরনের তাড়া অনুভব করেন। বাচ্চা একটি ছেলেকে মেরে ফেলল অথচ কেউ কিছু জানে না? এ খুনের হদিস তাকে করতেই হবে। খুনী কে?
নুরুল হাসান দ্রুতই সেখানে যান। ক্রাইম সিন দেখে নোট নেয়ার অভিজ্ঞতা তার ঢের আছে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুরু করেন তিনি। বাঙালির স্বভাবই হচ্ছে কিছু হলেই কৌতুহলী হওয়া। এখানেও যথারীতি ভিড় করে আছে শত শত মানুষ। নুরুল হাসান শুরুতেই হাক দেয়, ‘সবাই যার যার কাজে যান। পুলিশকে তার কাজ করতে দেন।’
ঘন ঘন বাঁশিতে জায়গাটা খালি করে ফেলে পুলিশ। ওসি সাহেব নোট বুক আর কলম নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। প্রথমেই বিভিন্ন কোণ থেকে ছবি তোলেন অগুণতি। ছেলেটা স্কুল ড্রেস পড়ে আছে। তার মানে খুনটা দিনের বেলা হয়েছে।
স্কুলে যাবার আগে হয়েছে, নাকি স্কুল থেকে আসার পরে?
স্কুলে খবর নিলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। ছেলেটি কখন স্কুলে গিয়েছিল কখন ফিরেছে টিচাররা বলতে পারবেন। তবে দেখে মনে হচ্ছে স্কুল থেকে ফেরত আসার পরে খুনটা হয়েছে। কারণ, জামার বুকের কাছে খাবারের দাগ লেগে আছে। স্কুলে বসে টিফিন খেয়েছিল রশীদ।
খুনটা কী দিয়ে করেছে?
ধারালো কিছু দিয়ে দেহ থেকে মাথা আলাদা করা হয়েছে। কিন্তু কাজটা করা হয়েছে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। কোনরকম ধস্তাধস্তি বা কাটা দাগ নেই কোথাও। সুস্থ একটা ছেলেকে এভাবে দু’টুকরো করা কঠিন কাজ। নিশ্চয় কোনভাবে ওকে অচেতন করা হয়েছে আগে। অথবা একজন চেপে ধরেছে আরেকজন কোপ দিয়েছে। তার মানে খুনী একের অধিক হতে পারে।
কোথায় খুন করা হয়েছে?
স্কুলের আশেপাশে হতে পারে। স্কুল থেকে বাড়িতে আসার পথে কিংবা বাড়িতে ফেরত আসার পরও হতে পারে। অবশ্য ছেলেটি স্কুল থেকে বের হয়ে অন্য কোথাও গিয়েছিল কীনা সেটাও খুঁজে বের করতে হবে। লাশ পুতে রাখার গর্তটা করা হয়েছে কোদাল দিয়ে। খুব বেশী গভীর করতে পারেনি। তাড়া ছিল বোধ হয়। দিনের বেলা এদিকটাতে খুব বেশী মানুষ আসে না। তবুও কেউ এসেছিল আশপাশে। তাই তাড়াতাড়ি গর্ত করে মাটি চাপা দিয়েই চলে গেছে খুনী।
কোন সূত্র রেখে গেল কী?
আশে পাশে তন্ন তন্ন করে খোঁজে নুরুল হাসান। তেমন কিছুই পায়না। হতাশ হয়। অভিজ্ঞতা বলে খুনী কিছু না কিছু রেখে যাবেই, যেকোন সূত্র। সে নিয়ম এখানে খাটছে না। শুকনো খটখটে মাটি। পায়ের ছাপ থাকারও কোনো সুযোগ নেই।
এলাকায় রাজনৈতিক দলাদলি আর ক্ষমতার পালাবদলে খুনখারাবি হয়। এই বাচ্চাটিও সেকারণে খুন হলো কীনা খুঁজে দেখতে হবে।
রশীদের বাবা-মার সাথে কথা হয় সেখানেই। দু’জনেই কাঁদছে। বেশ জোরে জোরেই কাঁদছে। সন্তানহারা পরিবারটির দুঃখ নুরুল হাসানকে ছুঁয়ে যায়। ‘আপনাদের কাউকে সন্দেহ হয়?’
‘জে না স্যার। কারও লগে আমাগো শত্রুতা নাই। কেমনে সন্দেহ করুম?’
‘তাও তো ঠিক।’ আর কোন প্রশ্ন করে না নুরুল হাসান।
লাশ নিয়ে সোজা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে চলে যান তিনি। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা দেখতে হবে। যা ভেবেছিল তাই। ভারী কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়েছে প্রথমে। এরপর অচেতন দেহকে কুপিয়ে দু’টুকরো করা হয়েছে। কিন্তু কে করল? কেন করল? অসহায় বোধ করে নুরুল হাসান। বহু খুনের তদন্ত করেছেন তিনি। অভিজ্ঞতা থেকে শুরুতেই কিছু একটা আন্দাজ করতে পারেন। সেই আন্দাজেই তদন্ত চালিয়ে যান। কিন্তু এই খুনের ব্যাপারে কোন আন্দাজই করতে পারছেন না। তবে নিজের উপর আস্থা আছে নুরুল হাসানের। একটা রাস্তা ঠিকই বেরিয়ে যাবে।
পরের দিন সকালে রশিদের স্কুলে চলে যান তিনি। ‘ঘটনার দিন রশীদ স্কুলে এসেছিল?’
খুনখারাবি, পুলিশ দেখে ক্লাস টিচার যথারীতি ভয়ে কাঁপছেন। ‘জ্বী স্যার, রশীদ স্কুলে এসেছিল।’
‘কখন বের হয়েছে?’
‘স্যার, স্কুল ছুটি হয় চারটায়। তবে ঐ দিন সে আগেই চলে গিয়েছিল। দুপুর একটার দিকে হবে বোধ হয়।’
‘কেন?’
‘রশীদ বলছিল, ওর শরীর ভাল লাগছে না।’
‘শরীরে কী হয়েছিল বলতে পারেন?’
‘ঠিক জানি না, স্যার। যতদূর মনে পড়ে, জ্বর-টরের কথা বলছিল।’ গলা শুকিয়ে আসে শিক্ষকের।
ওসি সাহেব ক্লাসের বাচ্চাদের পাশে গিয়ে বসেন। ‘রশীদকে চেনো?’
‘চিনি স্যার।’ চটপট জবাব দেয় রোগামত একটা ছেলে। নুরুল হাসান বিস্মিত, পুলিশ দেখে ভয় পায় না! মোলায়েম স্বরে তিনি বলেন ‘খারাপ লাগছে?’
‘জে স্যার। খারাপ লাগতাছে।’ বেঞ্চে বসা সেই বাচ্চাটি কেঁদেই ফেলে।
‘ঐদিন রশীদ আগে চলে গিয়েছিল, তাই না?’
‘জে স্যার। গায় জ্বর আছিল রশীদের। ব্যাথাও আছিল। ক্লাশ শেষ হওনের আগেই চইলা গেল।’
‘বাসার দিকে গিয়েছিল, না অন্য কোথাও?’
‘সোজা বাড়ির দিকে গেছিল, স্যার।’
নুরুল হাসান গাড়িতে বসে গোড়া থেকে শুরু করে। রশীদ স্কুলে এসেছিল। শরীর খারাপ লাগছিল তাই আগে বাসায় চলে গেছে। বাসায় যাবার পথে ও খুন হয়। বাসায় কে ছিল? রশীদের মা আর তাঁর কোলের বাচ্চা। ওসি সাহেব খবর নিয়েছেন, রশীদের বাবার কাপড়ের দোকান আছে বাজারে। লোকটি সকালে বাজারে আসেন আর সন্ধ্যার পর বাড়িতে ফেরেন। এই হয়ে আসছে প্রতিদিন।
এখনও পর্যন্ত কাউকে সন্দেহ করতে পারছেন না নুরুল হাসান। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সাথে কথা হয়েছে। মেম্বারের সাথেও। কেউ কোনো তথ্য দিতে পারে না। ‘এ কেমন কথা?’ মাথা ঝাঁকান তিনি।
পরদিন সোজা বাজারে চলে যান। রশীদের বাবার কাপড়ের দোকানে। ‘এইটাই আপনার দোকান?’
‘জে স্যার।’ লোকটা বিমর্ষ মুখে কাপড় কাঁটছিল। রশীদ মারা যাবার তিনদিন পর আজকেই দোকান খুলেছে সে।
‘এই লোকটা কে?’
‘আমার কর্মচারী।’
‘কী নাম তোমার?’ পচিশ-ছাব্বিশ বয়স হবে তার।
‘স্যার, আব্দুল মোত্তালিব।’
‘মোত্তালিব, তোমার কাজটা কী?’
‘কাপড় সেলাই করি, স্যার। মহাজন কাপড় কাঁটে আর আমি সেলাই করি।’
‘কেমন আয় হয়?’
‘স্যার খারাপ না, দিন চলে যায়।’ মোত্তালিব বেশ চটপট। ওসি সাহেবের জন্য চা-বিস্কুট আনিয়েছে এরই মধ্যে।
‘আপনি কয়টার সময় বাড়ি যান?’ রশীদের বাপের দিকে তাকিয়ে বলেন ূনুরুল হাসান।
‘বিয়ানে আসি স্যার। আন্ধার হইলে পর রওনা দেই।’
‘খাওয়া দাওযা কোথায় করেন?’
‘ভাত খাইয়া আসি। আর দুহারেরডা মোত্তালিব বাড়ি থিকা নিয়া আসে।’
‘মোত্তালিবও আপনার সাথে খায়?’
‘এইহানে খায় না। দুহারে আমার বাড়িতে খায়। খাওয়া শ্যাষে আমারডা লগে কইরা নিয়া আহে।’
‘আপনি বাড়িতে খেতে যান না কেন?’
‘দোকান ছাইড়া যাইতে মন চায় না। কামও থাকে মেলা।’
‘ও আচ্ছা।’
বলে রাস্তায় নামেন নুরুল হাসান। সারাদিনের জন্য একজন কনস্টেবল রশীদের বাড়ির আশে-পাশে লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সন্ধ্যায় সে খবর দেয়, দোকানের কর্মচারি ছাড়া আর কেউ আসেনি।
অত্যধিক বিচলিত নুরুল হাসান। কোন সূত্র পাচ্ছেন না তিনি। সবগুলো বিকল্প চিন্তা করেন- রাজনৈতিক দলাদলি না। রশীদের বাবা কোন দল করে না। ব্যবসায়িক কোন্দল? তাইলে বাবাকে না মেরে ছেলেকে মারবে কেন? জমি জিরাত নিয়ে শরীকের কোন্দল? তাও না, রশীদের কোন আত্মীয় এখানে নেই। স্কুলের বন্ধুরা খেলার ছলে মেরে ফেলেছে? শরীর দু’টুকরো করা, গর্ত খুড়ে মাটি চাপা দেয়া বাচ্চাদের কাজ না। শক্ত সমর্থ মানুষের কাজ।
রশীদের চারপাশে শক্ত সমর্থ মানুষ কে কে ছিল? স্কুলের মাস্টাররা, রশীদের বাবা, কর্মচারী, আর? আর কারো নাম মাথায় আসছে না।
স্কুলের মাস্টার মোটে তিনজন। তার দুইজনই বুড়ো। একজন যুবক, তবে সে অন্য গ্রামে থাকে। সে কেন খুন করবে? রশীদের বাবা খুন করতে পারে। নিজের ছেলেকে খুন করার কী কারণ থাকতে পারে? মোত্তালিব কাজটা করতে পারে। কিন্তু কেন? দোকান দখল করার চিন্তা থাকলে বাপকে খুন করবে, ছেলেকে কেন?
আরেকটা তথ্য ভেবে দেখা যায়। মোত্তালিব প্রতিদিন দুপুরবেলা রশিদের বাড়িতে যায়। ওখানে খায়, কিছু সময় কাটায়। এরপর টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে দোকানে ফেরত আসে। অনেকদিন ধরেই এই রুটিন চলে আসছে। রশীদও ঘটনার দিন দুপুরেই বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছিল।
মোত্তালিবের কাজকর্ম লক্ষ্য রাখা দরকার। রশীদের মায়ের সাথে কথা বলেন নুরুল হাসান। মহিলা কাঁদছেন তখনও। ‘মোত্তালিবকে চেনেন?’
‘জে চিনি। রশীদের বাপের দোকানের কর্মচারি।’ চোখ মুছে বলেন তিনি।
‘সে প্রতিদিন এ বাড়িতে আসে।’
‘জে স্যার। দুহারে খাইতে আহে। আর যাওয়ার সুম রশীদের বাপের লাইগা খাওন নিয়া যায়।’
‘কতক্ষণ থাকে সে?’
‘খাইতে যতক্ষণ লাগে।’
‘আপনি টিফিন ক্যারিয়ার আগেই ভর্তি করে রাখেন। নাকি মোত্তালিব আসার পর?’
মহিলা একটু থতমত খায়। ‘আগেই ভইরা রাহি।’
‘এমন কখনও হয়েছে যে, খাবার রেডি কিন্তু মোত্তালিব আসে নাই। ধরেন, ঝড়-বৃষ্টি হলো।’
‘না স্যার। মোত্তালিব পেত্যেক দিনই আহে। ঝড়-বৃষ্টি হইলেও আহে।’
‘মোত্তালিবের বাড়িতে কে কে আছে জানেন?’
‘হের বাড়ি পাশের গ্রামে। ওইহানে বাবা-মা আছে। হে বিয়া করে নাই এহোনো।’
‘এই দোকানে কাজ করার আগে কী করতো সে?’
‘রাজমিস্ত্রির কাম করত।’
‘মোত্তালিবের সাথে আপনার ভালই কথা-বার্তা হয় তাহলে?’
মহিলা থামেন একটু। ‘ওই খাওনের সময় যা এট্টু হয়। তয় মানুষটা কথা কইতে পারে।’
‘আচ্ছা, আমি যাই। আপনাকে ধন্যবাদ।’
নুরুল হাসান কোন কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। মোত্তালিবকে সন্দেহ করলে, খুনটা ও কেন করবে?
খুনটা যদি এ বাড়িতে হয় তবে দা-কোদাল সব এ বাড়িতেই আছে। গলা কাটার পর রক্ত বের হয়েছে তা আশে পাশেই আছে। রাতের অন্ধকারে তন্ন তন্ন করে খোঁজেন নুরুল হাসান। পেয়েও যান সহসা। বাড়ির পিছনের বাঁশঝাড়ের কাছে আলগা মাটি দেখে খুড়েন তিনি। অতি নিঃশব্দে, কেউ যাতে জানতে না পারে। দা আর কোদাল ওখানেই পাওয়া যায়। সাথে জমাট বাঁধা রক্ত। রশীদকে এখানেই খুন করা হয়েছে। এরপর লাশ জঙ্গলে পুতে ফেলা হয়েছে।
পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলেন নুরুল হাসান। কাল দুপুরে যখন মোত্তালিব খেতে আসবে সাবধানে ওদের কথা শুনতে হবে। বাঁশের বেড়ার ঘর। এত শক্ত না । ভিতরের কথা সব শোনা যায়। তবে আসল সমস্যা হচ্ছে লুকিয়ে থাকা। নুরুল হাসান বেড়ার আড়ালে ঘাপটি মেরে আছেন। কান খাড়া করে আছেন। কিছুটা উত্তেজিত। অভিজ্ঞ শরীরও একটু একটু করে ঘামছে। একটা প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবার সম্ভাবনা।
‘ও ভাবী, খাওন দাও না?’
‘মনটা ভাল নাইরে মোত্তালিব।’
‘ক্যান, কী হইছে?’
‘পোলাডার লাইগা পরান পুড়ে। ওসি সাব আইছিল আইজ। কী জানি সব জিগাইল। আমার ডর লাগতাছে।’
‘কী যে কও না! কীসের ডর? কেউ বুঝবারই পারব না আমরা কামডা সারছি। আর কয়দিন পর তোমার জামাইরে বাদ দিয়া আমার কাছে চইলা আসবা।’
‘পরানডা তো তাই চায়। কবের থিকা বইসা আছি। তোমার ঘরে যাইব।’
‘যাইবা, এট্টু ঠান্ডা হইলেই নিয়া যাইব। আইস একটু আদর কইরা দেই।’
ওসি সাহেব নিঃশব্দে চলে আসেন। খুনের মোটিভ তিনি পেয়ে গেছেন। মোত্তালিব প্রতিদিন দুপুরবেলা খাবার নিতে আসে এখানে। অনেকদিন ধরেই কাজটা করছে সে। ধীরে ধীরে রশীদের মা’র সাথে সম্পর্ক হয়ে যায়। এসময় বাড়িতে কেউ থাকে না। সম্পর্কটা শরীরের দিকে গড়ায়। রশীদ চারটার আগে বাড়িতে আসে না কখনও। নির্বিঘেœই সব চলছিলো। সমস্যা হয়েছে ঘটনার দিন শরীর খারাপ থাকায় হঠাৎ করেই আগেই স্কুল থেকে চলে আসে রশীদ। এরপর তার মা আর মোত্তালিবকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে। চিৎকার দেয় রশীদ। লোক জানাজানির ভয়ে হিতাহিতশূন্য হয়ে রশীদকে খুন করে ওরা দু’জনে। মহিলার মানসিক শক্তি দেখে অবাক হন নুরুল হাসান। এরকম নৃশংস একটি ঘটনা ঘটিয়ে কীভাবে শান্ত আছেন তিনি?
ফোর্স পাঠিয়ে দু’জনকেই গ্রেফতার করেন তিনি। জবানবন্দী নিয়ে চার্জশিট তৈরী করে আদালতে চালান করে দেন। মনটা শান্ত হয়। বাচ্চা ছেলেটির জন্য কষ্ট হয় মনের গহিনে। পুলিশ হলেও সে একজন মানুষ। নুরুল হাসানের মায়া একটু বেশিই। সহসা মুচকি হাসেনও তিনি – পত্রিকাগুলো মুখরোচক নিউজ পেয়ে গেল একটা। বিচিত্র কারণে এই জাতীয় খবর বেশ জনপ্রিয় দেশে।
কালই হয়তো খবরের কাগজে মোট হরফের হেডিংয়ে খবর বেরোবে- ‘মা’য়ের পরকীয়ার বলি কিশোর রশীদ’। নিউজে হয়তো ওসি নূরুল হাসানের কর্মদক্ষতার প্রশস্তিও থাকবে। এতে ঊর্ধ্বতনদের সুনজরেও হয়তো আসবেন তিনি। এমন একটি ক্লু লেস কেসের রহস্য উদঘাটনের জন্য হয়তো এবার পিপিএম পেয়েও যেতে পারেন। তার তো আনন্দিত হবার কথা। কিন্তু নূরুল হাসান যেন খুশি হতে পারছেন না। কোথায় যেন একটা বেদনার কাঁটা তাকে জর্জরিত করছে। সমাজটা এমন অরণ্য হয়ে গেল কেন? কেন মানুষগুলো এমন হায়েনার মতো নৃশংস হয়ে যাচ্ছে? ভেবে কূল পান না ওসি নূরুল হাসান।
গা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে বসেন তিনি। বেল টিপে কনস্টেবল ফজল মিয়াকে কড়া লিকারের এক কাপ চা দিতে বলেন। মনে মনে প্রস্তুতি নেন নতুন কোনো নৃশংসতার খবর শুনতে। এভাবেই তো চলে আসছে। হয়তো চলতেই থাকবে।