36 C
Dhaka
Sunday, January 24, 2021
No menu items!

এক প্রবাসীর চোখে বাংলাদেশের লকডাউন

সায়েদুর রহমান

আমরা যারা জীবিকার তাগিদে বিদেশে আছি, তারা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের পরিস্থিতি গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে থাকি। আমরা সব প্রবাসী মহামারী করোনার এ সংক্রমণকালে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা, আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা, চিকিৎসকদের আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেবার ক্ষেত্রে অপরিহার্য বিভিন্ন সরঞ্জামের সরবরাহ এবং চিকিৎসকদের আন্তরিকতা নিয়ে যেমন শঙ্কিত ছিলাম, ঠিক তেমনি শঙ্কিত ছিলাম বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে কিভাবে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা সম্ভব তা নিয়েও। এছাড়া লকডাউন সময়কালে দেশের বিপুল সংখ্যক কর্মহীন মানুষ কিভাবে তাদের জীবিকা নির্বাহ করবে তা নিয়েও আমরা প্রবাসীরা উৎকণ্ঠিত ছিলাম। কিন্তু করোনার সংক্রমণকালে সরকারের বিশাল প্রণোদনার প্যাকেজ দেখে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের প্রস্তুতি’র কথা শুনে আশান্বিতও হয়েছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম করোনার এ দুর্যোগকাল বাংলাদেশ হয়তো সমন্বিতভাবে মোকাবেলা করতে পারবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সে আশাবাদ ভেঙ্গে যেতে খুব বেশী সময় লাগেনি।

দেশকে কার্যত লকডাউন ঘোষণা করার পর সামাজিক দুরত্ব রক্ষা না করে বাবুই পাখির ঝাঁকের মতো মানুষের গ্রামের দিকে ছুটে যাওয়া, তাদের উৎসব উৎসব ভাব, গ্রামের হাট-বাজার এবং চায়ের দোকানে তাদের সরব উপস্থিতি ও জমজমাট আড্ডা সামাজিক দুরত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। তাদের ‘প্রাণ মিলাই এসো প্রাণের টানে’ ধরনের কর্মকান্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে জাতি হিসেবে আমরা এখনো কত অসচেতন রয়ে গেছি। সভ্য জাতি হিসেবে পৃথিবী’র মানুষের কাছে পরিচিতি পেতে আমাদের আরো অনেক সময় লাগবে। চিকিৎসা সামগ্রীর অপ্রতুলতা, মন্ত্রী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বাগাড়ম্বর, জনপ্রতিনিধিদের একাংশের চাল ও ত্রাণ সামগ্রী আত্মসাতের মহোৎসব, ব্যক্তির সাথে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা আমাদের ব্যথিত করেছে। জাতির এ দুর্যোগ মুহূর্তে আমরা একতাবদ্ধ ও দায়িত্ববান হওয়ার বদলে বিভক্ত ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ রেখেছি।

আমি আমার পরিচিত মানুষজনকে টেলিফোন করে জেনেছি, তাদের এইতো দিনে দুয়েকবার একটু বাজারে যেতে হয়। এই মাছের জন্য, একটু সবজি’র জন্য, তেল, নুন, চিনি’র জন্য। আমি তাদের বলেছি, আমি ব্যক্তিগতভাবে করোনার এ কালে সপ্তাহে একদিন মার্কেটে যাই কেনা-কাটা করার জন্য এবং দ্রুততার সাথে কেনাকাটা করে বাসায় চলে আসি। আমার বাসা থেকে পা বাড়ালেই পার্ক, সে পার্কে ভুলেও যাইনা। ভাত খেয়ে মোড়ের দোকান থেকে চা খাবার জন্য আমাদের মন ছটফট করে মরে না। আমার ছোট ছেলেটি বাইরে যাবার জন্য ব্যাকুল, বাইরে নিয়ে যাবার জন্য পাগল করে ফেলে। তবু ঘরেই আছি, সামাজিক দুরত্ব রক্ষা করে সুস্থ আছি।

আমি টেলিফোনে আমার স্বদেশের ভাই-বোন-বন্ধুদের অনুরোধ করেছি, ‘দয়াা করে তোমরা ঘরে থাকো। নিজেরা বাঁচো, অন্যকে বাচাঁর সুযোগ দাও। একদিন মানুষ মাছ না খেলে, সবজি না খেলে মরে যাবেনা। ধয়িাা পাতা ছাড়াও মসুরের ডাল সুস্বাদু হয়। দয়া করে তোমরা সংযমী ও মিতব্যয়ী হও। চায়ের দোকানে আড্ডা না দিলে, পরনিন্দা ও পরচর্চা না করলেও তোমাদের পেটের ভাত দুর্যোগের এ সময়ে যথারীতি হজম হবে। মহামারীর এ সময়ে দায়িত্ববান হও দয়া করে’। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, টেলিফোনের এ প্রান্ত থেকেও আমি স্পষ্ট বুঝাতে পারতাম আমার এ কথা শুনে তারা বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হচ্ছে। তাদের কথার স্বরে মনে হত আমি যেন তাদের আত্মহুতি দিতে বলছি। আর এ দুর্যোগে তাদের অতিধার্মিক সাজার কথা নাইবা বললাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো মসজিদ থেকে যেমন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি মন্দির থেকেও করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। এখন তো ধর্মীয় প্রার্থনালয় গমনের ওপর থেকে বিধি-নিষেধ উঠিয়ে নিয়েছে সরকার। আশা করি বাংলাদেশে আমার ধার্মিক ভাইয়েরা তাদের প্রার্থনার সময় ভুলে যাবেন না মহামারী করোনার কথা।

অবশ্য লকডাউন পুরোপুরি বলবৎ থাকার সময় আমার সোনার বাংলার মানুষ যে লকডাউন মেনে চলেছে তা নয়। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হল: বাংলাদেশের মাত্র ৫ ভাগ লোক পুরোপুরি লকডাউন মেনে চলেছে। ৩০ থেকে ৪০ ভাগ লোক বুঝে বা না বুঝে, ধর্মের নামে ও আবেগের কারণে আবার অনেক ক্ষেত্রে সরকারকে বিব্রত করার জন্য অব্যাহতভাবে লকডাউনকে লঙ্ঘন করেছে। যদি করোনার বিস্তারটা আরেকটু বেশী হত, পথে-ঘাটে লাশ বেশী পরিমানে পড়ে থাকত, তবে তাদের রাজনীতি করতে সুবিধা হত। ‘৭৪ সালকে টেনে আনা যেত, বাসন্তী নামক নতুন কোন স্ক্রিপ্ট লেখার চেষ্টা চলত ।

বাংলাদেশের লোকজন করোনা ভাইরাসকে চরম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবহেলা করার পরও সেভাবে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। হয়তো গরম প্রধান দেশ হওয়ায় বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা কম। অথবা যে জাতির ভেজাল, ফরমালিন ও রাসানিকের সাথে নিত্য বসবাস, করোনা ভাইরাস সে জাতির ক্ষতি করার আর কতটুকু ক্ষমতা রাখে? এদিক দিয়ে বাংলাদেশের লোকজন নিশ্চিতভাবেই ভাগ্যবান বলা যায়। আমার ধারনা শীত প্রধান দেশ হলে বাংলাদেশে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যায় এতদিনে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেত। বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী এ ভাইরাসের কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষতির শিকার হত। অপ্রিয় হলেও সত্য, এ ক্ষতি রোধ করার ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। বাংলাদেশে করোনার এ মহামারী পুরো পৃথিবীর জন্য বিভীষিকাময় হতো, যা বিশ্ববাসীর কোনদিন ভুলে যাওয়া সম্ভব হতোনা।

এছাড়া বাংলাদেশের বিশাল নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা না পারে হাত পাততে, না পারে ক্ষুধা জ্বালা সহ্য করতে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং কর্মজীবি মানুষ, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, সরকারের এ সাহায্য তাদের কতদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারতো তা নিয়ে আমি সন্দিহান। তাই লকডাউনের এ শিথিলতাকে আমার মন্দের ভাল বলে মনে হচ্ছে। আমরা হয়তো এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয় রুখে দিত পারবো।

এখন আমাদের যা করতে হবে তা হল মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, যদি সম্ভব হয় হ্যান্ড গ্লাভস পরিধান করতে হবে। গণপরিবহন যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে, গণপরিবহন যদি ব্যবহার করতে হয় সেক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক মাস্ক থাকতে হবে, গণপরিবহনে মানুষের সংখ্যা সীমিত করতে হবে। মার্কেট এবং দোকানে মানুষের সংখ্যা সীমিত এবং যতটুকু পারা যায় দুরত্ব বজায় রাখতে হবে। উৎসব, অনুষ্ঠানে বড় ধরনের জমায়েত বন্ধ রাখতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিধি মোতাবেক দুরত্ব বজায় রেখে প্রার্থনা করতে হবে। প্রার্থনার স্থান সর্বদা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। সর্বোপরি মানুষের মধ্যে ত্যাগ এবং সংযমের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। যদি আমরা তা করতে পারি, তবে করোনার বিরুদ্ধে এ মহাযুদ্ধে অবশ্যই জয়ী হব। সবাই ভালো থাকুন। ভালো থাকো আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

লেখক: অষ্ট্রিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী।

সর্বশেষ

বিবিএসের খানা জরিপ: দেশে ৪২ শতাংশ মানুষ এখন দরিদ্র

নিউজ ডেস্ক: করোনার প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার (আপার পোভার্টি রেট) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। দেশব্যাপী খানা পর্যায়ের জরিপের ভিত্তিতে এই তথ্য...

কারাগারে নারীর সঙ্গে বন্দির সময় কাটানোর ঘটনায় জড়িতরা শাস্তি পাবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, কারাগারে নারীর সঙ্গে সাজাপ্রাপ্ত বন্দির সময় কাটানোর ঘটনায় জড়িতরা বিধি অনুযায়ী শাস্তি পাবে। শনিবার একটি...

লন্ডন ফেরতদের কোয়ারেন্টাইনের সময় ৭ দিন বাড়লো

নিউজ ডেস্ক: লন্ডনফেরত যাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের সময় চারদিন থেকে বাড়িয়ে আবার ৭ দিন করা হয়েছে। মাত্র ৮ দিনের মাথায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলো...

কলকাতায় মোদি, মমতার সঙ্গে বিরল ছবি

নিউজ ডেস্ক: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মদিবস উপলক্ষে কলকাতা পৌঁছেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী । শনিবার স্থানীয় বিকেলে তিনি কলকাতা পৌঁছেন।

অন্ন বস্ত্রের সমাধানের পর গৃহহীনদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা : তথ্যমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, মানুষের তিনটি মৌলিক চাহিদা, অন্ন, বস্ত্র এবং বাসস্থান। বঙ্গবন্ধু...