36 C
Dhaka
Wednesday, January 27, 2021
No menu items!

একটি বাড়ি একটি ইতিহাস

আজাদ বুলবুল

আটচালা এই বাড়িটি তৈরি হয়েছে ষাটের দশকের শুরুতে। পরিবারের সদস্য, কাজের লোক, কর্মচারী মিলিয়ে এ ঘরটিতে থাকতেন তিরিশ জনের বেশি লোক। এই বাড়িটি একাত্তরে যেমন ছিল এখনো অনেকটাই তেমনি আছে। পুরাতন এই টিনের বাড়িটি আমার জেঠা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, তৎকালীন রামগঞ্জ থানার তুখোড় রাজনীতিবিদ, আওয়ামিলীগ নেতা শহীদ জি এম রুহুল আমিন সাহেবের। তাঁর বিধবা স্ত্রী আমার জেঠিমা ফিরোজা বেগমের ঐকান্তিক আগ্রহে এখনো বাড়িটি টিকে আছে।

বাড়িটির প্রতিটি ধুলিকনায় লেপ্টে আছে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অকথিত ইতিহাসের অজস্র উপাদান। ৭ মার্চ ১৯৭১রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর জনসভায় খিলপাড়া থেকে বাস ভাড়া করে একদল মানুষ জিএম রুহুল আমিনের নেতৃত্বে অংশ নিয়েছিলো। এ্যাডভোকেট বারি সাহের, জালাল কোম্পানি, গাজী মাশীহুর রহমান, গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, মোহাম্মদ হোসেন প্রমুখ গিয়েছিলেন সেই সভায়। সেখান থেকে ফিরে এসে পরবর্তী করনীয় বিষয়ে নানাবিধ আলোচনাসভা ও গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো এই বাড়িতে। যুদ্ধের শুরুতে হানাদার বাহিনীর হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য সহযোগিতা করা, সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা বিধান, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা, ট্রেনিংএর জন্য আগরতলায় পাঠানো, অস্ত্র গোলাবারুদ যোগাড় ও লুকিয়ে রাখার মত নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এই বাড়িতে বসে নেয়া হতো। খিলপাড়া, মল্লিকাদিঘির পাড়, সোমপাড়া, সাহাপুর, দশঘরিয়া, চাটখিল, কড়িহাটি, বজরা, সোনাইমুড়ী থেকে কর্মীরা আসতো নানান গোপন সংবাদ নিয়ে। খিলপাড়া বাজারে রাজাকার, হানাদার বাহিনীর চর ও মুসলিমলীগাররা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়, এই আশংকায় বাজার থেকে মাইলখানেক দূরে এই বাড়ির বৈঠকখানায়, কাচারি ঘরে বা উঠানের আঁধারে বসতেন নেতাকর্মীরা।

জুন জুলাই মাসে যুদ্ধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে রুহুল আমিন সাহেবসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। তাদের পরিচয়ও স্পষ্ট হয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে। সেকারণে অপরাপর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির মতে জিএম রুহুল আমিনও বাড়িছাড়া হয়ে গোপন আস্তানায় চলে যান। সেখান থেকে চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজ। রুহুল আমিন সাহেব বেশ কয়েক দিনের ব্যবধানে বাড়ি আসেন অল্প সময়ের জন্য। তাও দিনের বেলায়। বৃদ্ধা মাকে সালাম করে দোয়া নেন। স্ত্রীর কাছে সংসার সন্তানাদির কুশল জেনে নেন দুচার কথায়। আবার সাবধানী চোখ বুলিয়ে অনুসারীদের নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়েন পরবর্তী গন্তব্যে। নেতার অনুপস্থিতিতে বাড়িটির জমজমাট পরিবেশ বদলে যেতে থাকে। বিষন্ন নৈরাশ্য যেন গ্রাস করে বাড়ির চারিপাশকে।

ততদিনে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ি, বেগমগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরে বসেছে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। রাজাকার, আলবদর, প্রতিপক্ষ গ্রুপ আছে শক্তিশালী অবস্থানে। নেতৃবৃন্দ এখন আরও সাবধানী। জিএম রুহুল আমিন সাহেব রাত কাটান নৌকায়। নির্জন বিল, পাথার, গহীণ পাটক্ষেতের আড়ালে। কর্মী অনুসারীদের নিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় থাকেন। কিন্তু শেষ ঘটনাটি বিয়োগাত্মক বিষাদেই শেষ হয়। গ্রীক ট্র্যাজেডির নায়কের মতো ১৯৭১ সালের ২৪ আগস্ট রাতে শহীদ হন জিএম রুহুল আমিন। মাত্র ৩৯ বছরের তেজদীপ্ত এই মহান ব্যক্তির অকাল মৃত্যুতে ঝকঝকে টিনের আটচালা বাড়িটির বাতাস বিষন্ন বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে। অঝোর কান্না আর বুকফাটা বিলাপে হাহাকার করে ওঠেন প্রতিবেশী, স্বজন, সন্তানগণ।

আটচল্লিশ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন জিএম রুহুল আমিন। তাঁর সন্তানরা এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আর্থিকভাবেও তারা সাফল্য লাভ করেছে। নতুন বাড়ি বানিয়েছে। কিন্তু পুরাতন বাড়িটি তারা ভাঙেন নি।

শহীদ জিএম রুহুল আমিনের বিধবা স্ত্রী ফিরোজা বেগম বাড়িটি ভাঙতে বা বিক্রি করতে দেয় নি। মুক্তিযোদ্ধা শহীদ স্বামীর স্মৃতিবাহী এই বাড়িতে তিনি থেকেছেন আমৃত্যু। ২০১৮ সালে মৃত্যুর পূর্বেও তিনি আশাবাদী ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে তার স্বামীর অবদানের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে ইতিহাসের পাতায়। কোনো এক লেখক গবেষক হয়ত কোনোকালে এসে তাঁর আত্মত্যাগের বিবরণ লিখবেন। প্রথাবিরোধী কোনো নির্মাতা লড়াকু এই যোদ্ধাকে নিয়ে তৈরি করবেন তথ্যচিত্র। কিন্তু হায়! কিছুই দেখে যেতে পারেন নি তিনি। অব্যক্ত দুঃখবোধ নিয়ে মারা গেলেন তিনি।

আমরা কিন্তু আশাবাদী। শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশব্যাপী “বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে জানো” কার্যক্রমের আওতায় জীবিত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মানের নির্দেশনা দিয়েছে। প্রত্যেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহপূর্বক তথ্যচিত্র নির্মাণ করবে। ক্যামরা, পরিবহন ও অপরাপর খরচাদি বিদ্যালয় বহন করবে। এই গবেষণা ও ডকুমেন্টরি নির্মাণের প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থী ১০ নম্বর পাবে যা তার বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলের সাথে যোগ হবে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী অকুতোভয় বীরপুরুষ শহীদ জিএম রুহুল আমিনকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র এবার নির্মিত হতেই পারে। চাটখিলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে উদ্যোগী

লেখক
আজাদ বুললুল
গল্পকার ও ‘হালদা’ চলচ্চিত্রের কাহিনীকার।

সর্বশেষ

মার্চের প্রথম সপ্তাহে খুলবে ঢাবির হল

নিউজ ডেস্ক: মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে শুধুমাত্র অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষার্থীর মধ্যে যারা আবাসিক (শিক্ষার্থী) তাদের জন্য হল খুলে দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত...

বগুড়ায় আলোচিত তুফান সরকারের ভাই সোহাগ সরকার গ্রেফতার

বগুড়া প্রতিবেদক: ৯৯৯এ কলপেয়ে বগুড়ায় ট্রাক মালিককে আটকে রেখে মারপিট ঘটনায় আলোচিত তুফান ও মতিন সরকারের ভাই সোহাগ সরকার(৪০)কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।...

ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে খুলতে পারে সরকারি প্রাথমিক: প্রতিমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলে...

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস প্যারেডে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী

নিউজ ডেস্ক: আগামী ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস। করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে এবার কোনও বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত থাকবে না। তবে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্যারেডে...

দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে দেশে করোনা ভ্যাকসিন প্রয়োগের প্রাথমিক কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পরপরই নিবন্ধনের জন্য অনলাইন...