36 C
Dhaka
Saturday, January 16, 2021
No menu items!

আলোকিত সভ্যতা এবং প্রকৃতির প্রতিশোধ

রাজকুমার সিংহ
‘তোমরা কি সেই উন্মাদের কথা শোননি, যে উজ্জ্বল সকালে আলো জ্বালাতো, বাজারে ছুটে যেতো, আর অবিরাম চেঁচাতো, ‘আমি ঈশ্বরকে খুঁজি!’তার পাশে যে অবিশ্বাসীরা দাঁড়িয়েছিলো তাদের তাতে হাসির উদ্রেক করতো! ‘তিনি কি হারিয়ে গেছেন?’- একজন শুধিয়েছিলো। ‘তিনি কি শিশুর মত পথ হারিয়েছেন?’- অন্যজন শুধিয়েছিলো। ‘নাকি তিনি লুকিয়েছেন? তিনি কি আমাদেরে ভয় পান?’‘তবে কি তিনি অভিযানে গেছেন? নতুবা প্রবাসী হয়েছেন?’ এভাবেই তারা সোল্লাসে হেসে ওঠেছিলো।

উন্মাদটা তাদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো আর চোখ দিয়ে বিদ্ধ করেছিলো তাদের। ঈশ্বর কোথায়?’ সে চেঁচালো, ‘আমি বলছি! আমরা মেরে ফেলেছি তাঁকে- তুমি আর আমি। আমরা সবাই তাঁর খুনি। কিন্তু কীভাবে করলাম এটা? কীভাবে সমুদ্র পান করলাম? পুরো দিগন্ত মুছে ফেলার মত কাপড় কে দিলো আমাদের? আমরা কী করছিলাম, সূর্য থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করার সময়? কোনপথে ঘুরছে এখন এটা? সমস্ত সূর্য থেকে দূরে আমরা কোনপথে ঘুরে চলেছি? সবসময় কি ডুবছি না পেছনে, সামনে, পাশে, সবদিকে? অদৌ কি উপর বা নীচ বলে কিছু আছে? এক অসীম শূন্যতার ভেতর দিয়ে আমরা কি বিপথে যাচ্ছি না? অনুভব করি ফাঁকা মহাকাশের নিঃশ্বাস? সেটা কি শীতল হয়ে যাচ্ছে না?

ধেয়ে আসছে না রাত সবসময় আমাদের দিকে? আমাদের কি সকালেও লণ্ঠন জ্বালানো প্রয়োজন? এখনো কি আমরা কবর খোঁড়ার শব্দ পাচ্ছি না? কারা ঈশ্বরকে কবর দিচ্ছে? এখনো কি আমরা স্বর্গীয় পচনের গন্ধ পাচ্ছি না? ঈশ্বরও পচে যায়। ঈশ্বর মৃত। ঈশ্বরমৃত হাওয়া চালিয়ে যায়। এবং আমরা খুন করেছি তাঁকে। সমস্ত খুনীদের খুনি আমরা কীভাবে নিজেদের সান্ত¡না দেবো?

পৃথিবীতে পবিত্রতম আর সর্বোত্তম যা ছিলো মৃত্যু অবধি রক্ত ঝরেছে আমাদের ছুরির নিচে; কে আমাদের থেকে সেই রক্ত মুছে দেবে? নিজেদের মুছার মত কোন জল আছে কি? প্রায়শ্চিত্তের কোন অনুষ্ঠান, পবিত্রতার কোন খেলা আমাদের আবিস্কার করতে হবে? এই কাজের মহানতা কি আমাদের জন্য আরো মহান নয়? আমরাই কি তাঁর যোগ্য হয়ে ঈশ্বর হয়ে ওঠতে পারি না? এর থেকে মহান কাজ আজ আর হয়নি, আর যারা আমাদের পরে জন্মাবে-এই কাজের স্বার্থে তারা আজ অবধি ইতিহাসেরও উন্নত ইতিহাসের হবে।’

এখানেই উন্মাদটা নীরব হয়ে পড়ে আর তার শ্রোতাদের দিকে তাকায়, তারাও নীরব হয়ে তাকিয়ে থাকে অপলক বিষ্ময়ের সাথে। শেষমেষ সে লণ্ঠনটাকে মাটিতে ছুড়ে মারে আর টুকরো টুকরো করে চলে যায়। ‘আমি খুব তাড়াতাড়ি চলে এসেছি’, সে বলে, ‘আমার এখন সময় নয়।’এই ভয়ানক ঘটনাটা পথেই রয়েছে, এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে, মানুষের কান অবধি পৌঁছায়নি। বিদ্যুৎ আর বজ্রপাতে সময় লাগে।

এই ঘটনা মানুষের কাছে দূরতম নক্ষত্ররাজি থেকেও দূরে রয়ে গেছে- অথচ তারা নিজেরাই এসব করছে। এটাও শোনা যায়, ওইদিনই নাকি উন্মাদটা বেশকিছু গির্জায় ঢুকেছিলো জোর করে আর সেখানে নিজের মৃতসত্বার উদ্দেশে স্তবগান গেয়েছিলো। তাকে বের করে দিয়ে এর কারণ জানতে চাইলে সে বারবার বলেছিলো; ‘এই গির্জাগুলোর আর প্রয়োজন কী, যদি ঈশ্বরের সমাধি বা স্মৃতিসৌধই না হতে পারে?’

জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিক নিটশের(১৮৪৪-১৯০০) বিখ্যাত বই ‘The gay Science’ এ উপরোক্ত নাটকীয় সংলাপের মাধ্যমে তিনি তখনকার অস্থিতিশীল ইউরোপের নৈতিক স্খলন এবং তার পরিণতি ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। ইউরোপীয় সভ্যতা খ্রিস্টধর্মের ঈশ্বররের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত, নীটশের মতে ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস হারানোর ফলে ইউরোপীয় সভ্যতায় এক বিরাট শূন্যতা এসেছে- ঈশ্বরের পরিবর্তে তাই সেখানে বিরাজ করছে শূন্যতা। নীটশে সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন যে, এ শূন্যতা অশুভ, বিপজ্জনক। নীটশের ভবিষ্যতবাণী মিথ্যা হয়নি, দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ তার প্রমাণ।

আসলে নীটশে কী বলতে চেয়েছিলেন? তিনি কি আস্তিক, না নাস্তিক? প্রকৃতপক্ষে তাঁর ধারণার মধ্যে ছিলো ডারউইনের প্রভাব। এ জগতে প্রাণীকূলের বেঁচে থাকার জন্য অবিরাম সংগ্রামের যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ডারউইন দিয়েছিলেন, তা উনবিংশ শতাব্দীর চিন্তাধারাকে বেশ আলোড়িত করেছে। বেঁচে থাকার তাগিদে জীবন-মৃত্যুর নির্মম সংগ্রামের মতবাদ পরবর্তীকালে সর্বত্র এক নতুন নৈতিকতার জন্ম দিয়েছে, ধনতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী দেশগুলোতে শ্রেণি-সংগ্রাম ও উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটেছে। ডারউইনের বৈজ্ঞানিক মতবাদকে স্বীকার করে নিয়েই তিনি বলতে চেয়েছেন, ‘যোগ্যতমের টিকে থাকা’- নীতিকে নৈতিকতা হিসাবে গ্রহণ করে মানুষ ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। একই সাথে তিনি বিবর্তনের ধারায় মানুষের ক্রমোন্নতির তত্বকে মানছেন, কিন্তু এই বিবর্তনের ধারায় দুর্বলের ওপর সবলের আগ্রাসনকে শেষপর্যন্ত মেনে নিতে পারেননি। ফলশ্রুতিতে তিনি নিজেই একসময় পরস্পরবিরোধী মতবাদের দ্বন্ধ নিরসনে ব্যর্থ হয়ে উন্মাদ হয়ে পড়েন। তিনি না পারছিলেন ঈশ্বরের ধারণাকে স্বীকার করতে, না পারছিলেন মেনে নিতে।

ইউরোপীয় পটভূমি এবং খ্রিস্টধর্মের বলয়ে থেকে নীটশে যে দর্শনের জন্ম দিয়েছিলেন, তার প্রভাব কিন্তু ব্যাপক। আগ্রাসী মনোভাবসম্পন্ন মানবজাতি কিন্তু ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে ওঠছিলো। আকাশ-বাতাস, পাহাড়-সমুদ্র, সুমেরু-কুমেরু সবকিছুকে পরাভূত করে ক্ষান্ত হয়নি তারা। উন্নত বিশ্ব খেই হারিয়ে বিশ্বজয়ের নেশায় যেভাবে উন্মাতাল, অনুন্নত বিশ্বও আধুনিক বিজ্ঞানের সুবিধাপ্রাপ্ত হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করে দিয়েছে। বিশেষ করে বিগত কয়েকবছর ধরে যা লক্ষ্মণীয়, তা হলো মানুষের মধ্যে ইতিবাচক চিন্তার অনুপস্থিতি। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, কর্তব্যপরায়ণতা ইত্যকার মানবিক মূল্যবোধগুলো থেকে ক্রমে মানুষ যেন বিচ্যুত হয়ে আসছে। নৈতিকতাবোধ আজ শূন্যের কোঠায়। ক্রমে সামাজিক পরিবর্তন এমন রূপ নিচ্ছিলো যে, মিথ্যাচারই যেন বৈধ প্রথা। শুধু প্রয়োজনে নয়, অপ্রয়োজনেও মানুষ মিথ্যা বলতে বা চাপাবাজি করতে উৎসাহী। তাছাড়া ভুল স্বীকার করার মানসিকতা বিলুপ্তপ্রায়। কেউ হারতে চায় না, যেনতেনপ্রকারে জিততেই হবে, এমন মানসিকতা লালন করে যুদ্ধংদেহী রূপ নিয়ে অগ্রসরমান লোকজন সত্যি ভীতিকর রূপ নিচ্ছিলো। নিজেকে জাহির করার আপ্রাণ প্রচেষ্টাও আর একটি লক্ষ্মণীয় ও উদ্বেগের বিষয় বটে। নিজেকে জাহির করতে গিয়ে কপটতার আশ্রয় নেয়া ক্রমে যেন সীমা লঙ্ঘনের পর্যায়ে চলে যাচ্ছিলো। লোভ-লালসা? সে আর এক মহামারী রোগ! সব মিলিয়ে পৃথিবী নামের এ গ্রহটি যেন ক্রমশ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে ওঠছিলো। সজ্জনরা বলতে শুরু করেছেন, সাধু সাবধান। অন্যদিকে ধর্মীয় বিদ্বেষ বিষাক্ত ভাইরাসের মত সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে প্রবল-প্রতাপে ছড়িয়ে পড়ছিলো মানুষের মস্তিষ্কে, শিরায় শিরায়।

এমনই এক ক্রান্তিকালে ‘করোনা’ নামের এক ভয়াবহ ভাইরাস অশরীরী যমদূত(!) হয়ে মানবজাতির স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে চরম সংকট এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ‘আমার কিছু হবে না’- এমনটা বলার সাহস এখন কারো নেই। ঈশ্বর আজ কোথায়? কে তাঁকে স্মরণ করলো, কে করলো না, কাকে তিনি রক্ষা করবেন, কাকে করবেন না, কেউ কি বলতে পারেন? মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা আজ জনশূন্য। নীটশের মত বলতে ইচ্ছে করে, ঈশ্বর মৃত। অথবা তিনি পলাতক(!)। তা না হলে হাজার বছরের বোধ বিশ্বাসে লালিত ঈশ্বর আজ কেন পরাজিত? বিজ্ঞান দাবি করে, ঘটনাচক্রে জন্ম আমাদের, মৃত্যুও হবে ঘটনাচক্রেই। তবুও সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী মানুষ পরম শ্রদ্ধায়, বিশ্বাসে ডাকছেন তাঁকে, অথচ কুকর্ম, কুচিন্তা, কুমতলব থেকে বিরত থাকতে চায় না। কেন? যে ঈশ্বর সবকিছু প্রত্যক্ষ করছেন, তিনি কি এসব অনাচার দেখতে পাচ্ছেন না? করোনা আতঙ্কে দিশেহারা মানুষ আজ বুঝতে পারছে, প্রকৃতির কাছে মানুষ কত অসহায়! অথচ এ ক্রান্তি মুহূর্তেও ত্রাণসামগ্রী চুরির মত ন্যাক্কারজনক কাজ, ধর্মীয় হানাহানি চলছে তো চলছেই। মানুষের কি কখনো বোধোদয় হবে না?

যে কারণেই, বা যেভাবেই করোনা থাবা বসাক, বিশ্ববাসীর জন্য এ এক বিরাট হুমকি বটে। ভাবি, একেই কি বলে প্রকৃতির প্রতিশোধ? তাই যদি হয়ে থাকে, তবে আমাদের নতুন করে একবার ভাবার সময় এসেছে। করোনা একদিন প্রতিহত হবেই। কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই, এ অসহায়ত্বের কথা। অন্তিম মুহূর্তে ‘মানুষ মানুষের জন্য’-এটাই চরম সত্য। তাই হিংসা-বিদ্বেষ, ভেদ-বিভাজন ভুলে মহাকালের বিবেচনায় অতি সামান্য সময়ের জন্য পৃথিবীতে অতিথি হিসাবে আসা মানবজাতি যেন সম্প্রীতির বন্ধনে একে অন্যকে আবদ্ধ করে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি।

রাজকুমার সিংহ
শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক(২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ব্র্যাক ব্যাংক- সমকাল সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত)

সর্বশেষ

কলকাতায় নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ড জিতেছে ‘নোনা জলের কাব্য’, যাচ্ছে গুটেনবার্গ চলচ্চিত্র উৎসবেও

বিনোদন প্রতিবেদক: গুটেনবার্গ চলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রণ পেয়েছে রেজওয়ান শাহরিয়ারের ‘নোনা জলের কাব্য’। ইউরোপের মর্যাদাপূর্ণ এ উৎসবের ‘ইঙ্গমার বার্গম্যান অ্যাওয়ার্ড’ বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া...

ফাইজারের টিকা কম আসায় ক্ষুব্ধ ইউরোপীয় ইউনিয়ন

নিউজ ডেস্ক: ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বেশ কয়েকটি দেশে প্রত্যাশার চেয়ে ফাইজারের কম টিকা পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ধীরগতিতে টিকার চালান দেওয়ায়...

এবার সব ধরনের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলো যুক্তরাজ্যে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ছড়িয়ে পড়া নতুন ধরনের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এবার সব ধরনের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য। আগামী সোমবার (১৮ জানুয়ারি)...

বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই ওয়াশিংটন ছাড়বেন ট্রাম্প

নিউজ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে না থাকার কথা আগেই জানিয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার জানা গেল, বাইডেন...

৬০ পৌরসভায় ভোটগ্রহণ চলছে

নিউজ ডেস্ক: দ্বিতীয় ধাপে দেশের ৬০টি পৌরসভায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। শনিবার (১৬ জানুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে চলবে একটানা বিকেল...