বার কাউন্সিলের রিভিউ ফলাফল বাতিল : প্রশাসনিক ন্যায়ের ব্যত্যয় ও বৈধ প্রত্যাশার লঙ্ঘন

প্রকাশ : 2026-01-09 10:43:02১ |  অনলাইন সংস্করণ

  নিউজ ডেস্ক   

বার কাউন্সিলের রিভিউ ফলাফল বাতিল : প্রশাসনিক ন্যায়ের ব্যত্যয় ও বৈধ প্রত্যাশার লঙ্ঘন

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল একটি সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, যার উপর আইন পেশার মান রক্ষা, আইনজীবী তালিকাভুক্তি এবং পেশাগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব অর্পিত। এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বার কাউন্সিল কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্বই প্রয়োগ করে না; বরং তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক ন্যায়, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের (Rule of Law) মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়াই প্রত্যাশিত। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের আইনজীবী তালিকাভুক্তি লিখিত পরীক্ষার রিভিউ ফলাফল বাতিলের সিদ্ধান্ত আইন ও ন্যায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

২৫ অক্টোবর বার কাউন্সিলের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের দাবির মুখে ২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে বার কাউন্সিল কর্তৃক প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন আহ্বান করা হয়। নির্ধারিত বিধি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন গ্রহণ এবং পর্যালোচনা শেষে ১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও এনরোলমেন্ট কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে রিভিউ ফলাফল প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে ১৯১৪ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তী ধাপ হিসেবে ভাইভা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের একটি সুস্পষ্ট আইনসম্মত অধিকার ও বৈধ প্রত্যাশা (Legitimate Expectation) অর্জন করেন।

আমরা জানি, প্রশাসনিক আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—কোনো কর্তৃপক্ষ যখন আইনানুগভাবে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রকাশ করে, তখন সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, তা যুক্তিসংগত কারণ, স্বচ্ছ তদন্ত ও যথাযথ প্রক্রিয়া (Due Process) ছাড়া হঠাৎ করে প্রত্যাহার করা যায় না। এটি প্রাকৃতিক বিচারের (Natural Justice) একটি মৌলিক অনুষঙ্গ। 

কিন্তু এই প্রতিষ্ঠিত নীতির সম্পূর্ণ ব্যত্যয় ঘটিয়ে রিভিউ ফলাফল প্রকাশের মাত্র কয়েক দিনের মাথায়, অতি সীমিত সংখ্যক ব্যক্তির আপত্তির প্রেক্ষিতে ২৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে একটি আরেকটি নোটিশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ রিভিউ ফলাফল বাতিল ঘোষণা করে বার কাউন্সিল। সেখানে তারা উল্লেখ করে যে, ‘রিভিউ আবেদনকারী প্রার্থীগণের মধ্যে যেসব অকৃতকার্য প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় নূন্যতম ৪৭ নম্বর পেয়েছে তাদেরকে ৩ নম্বর গ্রেইস হিসেবে প্রদানপূর্বক বার কাউন্সিল পরীক্ষা-বিধি অনুযায়ী পাস মার্ক নূন্যতম ৫০ বিবেচনা করতঃ সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদেরকে বিগত ১৮-১১-২০২৫ইং তারিখে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরও ঘোষণা করা হয়, ‘ফলে এনরোলমেন্ট কমিটি অদ্য ২৩-১১-২০২৫ইং তারিখের বিশেষ জরুরী সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, বিগত ১৮-১১-২০২৫ইং তারিখে প্রকাশিত রিভিউ ফলাফল বাতিলপূর্বক রিভিউ আবেদনকারী প্রতিটি প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনঃমূল্যায়ণ করা হবে।’ এ সিদ্ধান্ত স্পষ্টতই প্রশাসনিক ক্ষমতার অসামঞ্জস্যপূর্ণ (Disproportionate) প্রয়োগের শামিল।

যেহেতু রিভিউ উত্তীর্ণ প্রার্থীরা গ্রেস নম্বর প্রদানের মাধ্যমে উত্তীর্ণ ঘোষণার জন্য কোনো প্রকার আবেদন বা প্রার্থনা করেননি। সংশ্লিষ্ট এনরোলমেন্ট কমিটি তাদের স্বতঃপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা ও বিবেচনার ভিত্তিতে প্রার্থীদের প্রত্যেককে ৩ (তিন) নম্বর গ্রেস প্রদান করে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তীর্ণ ঘোষণা করে। উক্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণার মাধ্যমে প্রার্থীদের পক্ষে একটি বৈধ অধিকার (vested right) সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে কোনো প্রকার প্রতারণা, তথ্য গোপন, আইন লঙ্ঘন কিংবা যথাযথ কারণ দর্শানো ও ন্যায্য শুনানির সুযোগ প্রদান ব্যতীত উক্ত উত্তীর্ণ ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল করা সংবিধানের ন্যায্যতা ও আইনগত নিশ্চিততার নীতির পরিপন্থী এবং আইনগতভাবে টেকসই নয়।

এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে—কোনো বিস্তারিত কারণ দর্শানো হয়নি, কোনো স্বচ্ছ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের কোনো প্রকার শুনানির সুযোগ (Right to be Heard) প্রদান করা হয়নি। আইনের শাসনের একটি মৌলিক উপাদান হলো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা ও স্থায়িত্ব। একটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত ও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত ফলাফল হঠাৎ করে বাতিল হলে শুধু সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়।

এই সিদ্ধান্তের মানবিক প্রভাব আরও গভীর ও উদ্বেগজনক। রিভিউ ফলাফল প্রকাশের পর উত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সহকর্মীদের অবহিত করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ পেয়েছে এবং আদালত প্রাঙ্গণেও স্বাভাবিকভাবেই উদযাপন হয়েছে। পরবর্তীতে ফলাফল বাতিল হওয়ায় তারা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন এবং মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন।

অনেকে ইতোমধ্যে তীব্র মানসিক চাপ, হতাশা ও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। এটি আর নিছক একটি পরীক্ষার ফলাফল সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি হাজারো শিক্ষানবিশ আইনজীবীর জীবন, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে ঘিরে একটি গভীর মানবিক ও আইনগত সংকট। এমন পরিস্থিতিতে আত্মহননের ঝুঁকির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যা কোনো দায়িত্বশীল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত বিবেচ্য বিষয়।

তবে এই সংকট নিরসনের পথ এখনো উন্মুক্ত। বার কাউন্সিল চাইলে—রিভিউ ফলাফলে উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের ফলাফল বহাল রেখে বাকী খাতাগুলো মূল্যায়ন করে একটি ফলাফল প্রকাশ করতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ প্রশাসনিক ন্যায়, proportionality এবং fairness—এই তিনটি মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কেবল একটি পরীক্ষার আয়োজক নয়; এটি আইন পেশার অভিভাবক প্রতিষ্ঠান। সেই অভিভাবকত্বের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে তখনই, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষমতার নয়, ন্যায়ের প্রাধান্য দেওয়া হয়। রিভিউ ফলাফল পুনর্বহাল কোনো অনুকম্পা নয়—এটি রিভিউ উত্তীর্ণ ১৯১৪ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবীর আইনসম্মত অধিকার ও বৈধ প্রত্যাশার স্বীকৃতি। এই সিদ্ধান্তই প্রমাণ করবে, বার কাউন্সিল সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন ও প্রশাসনিক ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধ।


লেখকঃ অ্যাডভোকেট, খুলনা জজ কোট।