পদ্মার বুকে চরাঞ্চলের মানুষের অনিশ্চয়তার লড়াই

প্রকাশ : 2026-04-16 18:34:30১ |  অনলাইন সংস্করণ

  নিউজ ডেস্ক   

পদ্মার বুকে চরাঞ্চলের মানুষের অনিশ্চয়তার লড়াই

প্রমত্তা পদ্মা নদীর বুকে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পদ্মার বুকে জেগে ওঠা বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের জীবন যেন প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, যোগাযোগ সংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ- সব মিলিয়ে তাদের দিন কাটে চরম দুর্ভোগের মধ্যে।

পদ্মার ভাঙন এখানে একটি চক্রের মতো। একদিকে ভাঙে, অন্যদিকে গড়ে ওঠে নতুন চর। কিন্তু এই গড়ার পেছনে লুকিয়ে থাকে বহু পরিবারের সর্বস্ব হারানোর বেদনা। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন নতুন করে বসতি গড়ার সুযোগের জন্য। কারও সেই অপেক্ষা এক দশক ছাড়িয়ে যায়।

চর জেগে উঠলেই মানুষ ছুটে যায় নতুন আশায়, কিন্তু সেখানে শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। জীবিকার জন্য কৃষি ও মাছ ধরা প্রধান ভরসা হলেও তা পুরোপুরি প্রকৃতিনির্ভর। ফলে বন্যা, খরা বা নদীভাঙনের ধাক্কায় মুহূর্তেই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

চরাঞ্চলের মানুষের অন্যতম বড় সমস্যা যোগাযোগব্যবস্থা। অধিকাংশ এলাকায় কোনো পাকা সড়ক নেই, নৌকাই ভরসা। বিশেষ করে বর্ষায় নদীর স্রোত বেড়ে গেলে যাতায়াত হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। এতে রোগী হাসপাতালে নেওয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া—সবই বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রতিবছর বর্ষা এলেই নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে যায় বসতি, ভেসে যায় ঘরবাড়ি। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে অনেক পরিবার সাময়িকভাবে অন্যত্র আশ্রয় নেয়।

শিবচরের চরজানাজাত, কাঠালবাড়ি ও মাদবরের চর এলাকায় দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ এখনো মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত। রাস্তাঘাট নেই, বিদ্যুৎ নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র।

চরজানাজাত ইউনিয়নের বাসিন্দা আলি ফকির বলেন, এখানে নৌকা ছাড়া চলার উপায় নেই। অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন। অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে ছোট রোগও বড় হয়ে যায়।

কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের সুজাই চৌকিদার বলেন, আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না। প্রতিবছর ভাঙনে ঘর হারাই, আবার নতুন করে শুরু করি। কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়া পাই না।

কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের সোহেল ব্যাপারী জানান, একাধিকবার নদীভাঙনে তার বসতভিটা বিলীন হয়েছে। বর্তমানে তিনি অন্যের জমিতে চাষাবাদ ও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার ভাষায়, আমরা যেন আলাদা এক জগতে বাস করি, যেখানে মৌলিক সুবিধাগুলো এখনো স্বপ্ন।

চরাঞ্চলের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও উদ্বেগজনক। যোগাযোগ সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। অনেক শিশু অল্প বয়সেই জীবিকার সন্ধানে নেমে পড়ে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কলেজছাত্রী মিম আক্তার বলেন, চর থেকে উপজেলা সদরে গিয়ে পড়াশোনা করা খুব কঠিন। নিয়মিত যাতায়াত করা সম্ভব হয় না। এখানে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য টেকসই বাঁধ নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা জরুরি। সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়। অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবা সম্প্রসারণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি না হলে চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।পদ্মার বুকে গড়ে ওঠা এসব চর যেন দেশের এক ভিন্ন বাস্তবতা—যেখানে প্রতিদিনই বেঁচে থাকা মানে নতুন করে লড়াই শুরু করা।