ভাইরাল সেই বৃদ্ধ শাকিবের ছবি, নেপথ্যের কারিগর পেলেন জাতীয় স্বীকৃতি
প্রকাশ : 2026-01-31 12:09:28১ | অনলাইন সংস্করণ
নিউজ ডেস্ক
অশীতিপর এক বৃদ্ধ। পরনে সাদা পায়জামা–পাঞ্জাবি। পায়জামায় ছোপ ছোপ দাগ। মুখে ক্লান্তি, চোখে শঙ্কা আর জীবনের ভার। প্রথম দেখায় ঠিক চেনা যায় না, আবার চেনা চেনাও লাগে। পরে বুঝতে সময় লাগে—এই বয়স্ক মানুষটি আসলে শাকিব খান। প্রায় দুই যুগের ক্যারিয়ারে এই অভিনেতাকে এমন রূপে আগে কখনো দেখা যায়নি।
বছর তিনেক আগে ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার সেই লুক প্রকাশের পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় ওঠে। ভক্ত থেকে শুরু করে সহকর্মী—সবাই চমকে যান। প্রশ্ন ওঠে একটাই—এই মেকআপের পেছনে কে?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আলোয় এলেন পর্দার আড়ালের এক নীরব শিল্পী—রূপসজ্জাশিল্পী সবুজ খান। পর্দায় যাঁকে দেখা যায় না, কিন্তু যাঁর ছোঁয়ায় তৈরি হয় পর্দার অবিস্মরণীয় রূপ—বাংলাদেশি সিনেমার সেই নীরব শিল্পী এবার পেলেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিন শতাধিক সিনেমায় পর্দার আড়ালে কাজ করা সবুজ খান পাচ্ছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩–এ শ্রেষ্ঠ মেকআপম্যানের সম্মান।
পর্দার আড়াল থেকে জাতীয় স্বীকৃতি
ধারণা করা হচ্ছে, যে মেকআপ দেখে দর্শক শাকিব খানকে চিনতেই ভুল করেছিলেন, সেই কাজের স্বীকৃতিই তাঁকে পৌঁছে দিল দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে। এই অর্জন তিনি উৎসর্গ করেছেন শাকিব খানকেই।এক সাক্ষাৎকারে সবুজ খান বলেন, ‘আমার এই পুরস্কারটা আমি আমার বসকে উৎসর্গ করছি। তাঁর কারণেই আজ আমি এই জায়গায়।’
শরীয়তপুর থেকে এফডিসি
সবুজ খানের বাড়ি শরীয়তপুরে। ঢাকায় একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনার সময়েই তাঁর জীবনের পথ ঘুরে যায়। এলাকার এক বড় ভাই ফারুকের সঙ্গে নিয়মিত যাতায়াত শুরু হয় এফডিসিতে। ফারুক সেখানে খাবারের ব্যবসা করতেন। সেই সূত্রেই সিনেমার মানুষদের খুব কাছ থেকে দেখা, শেখার সুযোগ পান সবুজ।
সহকারী হিসেবে শুরু। ধীরে ধীরে হাত পাকানো। একসময় নিজেই হয়ে ওঠেন মেকআপম্যান। ২২ বছর ধরে তিনি কাজ করছেন শাকিব খানের ব্যক্তিগত রূপসজ্জাশিল্পী হিসেবে। ‘নষ্ট ছাত্র’ সিনেমা থেকে শুরু—এরপর শাকিব খানের প্রায় সব আলোচিত সিনেমার লুক তৈরি হয়েছে তাঁর হাতেই।
বর্তমানে সবুজ খানের সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করছেন প্রায় ১০ জন মেকআপম্যান। তাঁরা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নাটক ও মিউজিক ভিডিওতেও নিয়মিত কাজ করছেন।
‘প্রিয়তমা’ ও সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ
‘প্রিয়তমা’ সিনেমায় শাকিব খানের বৃদ্ধ অংশটুকু ছিল মাত্র ছয়–সাত মিনিটের। কিন্তু এই সামান্য সময়টাই হয়ে ওঠে সিনেমার অন্যতম আলোচিত দৃশ্য।সেই সময় পরিচালক হিমেল আশরাফ জানান, ‘শাকিব খানকে এমন রূপে আগে দেখা যায়নি। উনি রাজি হবেন কি না, সেটা নিয়ে দ্বিধা ছিল। কিন্তু চিত্রনাট্য পড়ে উনি নিজেই এই অংশটি করতে দারুণ আগ্রহ দেখান।’
এই লুক তৈরিতে ব্যবহার করা হয় জটিল প্রস্থেটিক মেকআপ। প্রথমে নেওয়া হয় শাকিব খানের মুখমণ্ডলের নিখুঁত মাপ। এরপর তৈরি করা হয় বিশেষ আবরণ। হাতে হাতে বসানো হয় চুল–দাড়ি। একাধিকবার করা হয় লুক পরীক্ষা।
দিনে সাত ঘণ্টার মেকআপ, তুলতে আরও তিন ঘণ্টা
সাক্ষাৎকারে সবুজ খান বলেন, ‘প্রস্থেটিক মেকআপ ভীষণ কঠিন। একটানা বসে থাকতে হয়। ভুল করার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিদিন মেকআপ দিতে আমাদের ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগত। আর মেকআপ তুলতেই লাগত আরও প্রায় তিন ঘণ্টা।’
এই মেকআপ নিয়ে টানা তিন দিন কাজ করতে হয় পুরো টিমকে। শাকিব খানকে দুই দিন সকাল সাতটা থেকেই বসতে হয়েছে মেকআপ চেয়ারে।
খরচের দিক থেকেও এটি ছিল বড় সিদ্ধান্ত। পরিচালক জানান, এই মেকআপের খরচে অনায়াসে সিনেমার কয়েকটি মারপিট দৃশ্য করা যেত। একটি সূত্রের ভাষ্য, খরচ ছিল পাঁচ লাখ টাকার কম নয়।
স্বপ্ন পূরণ হয়েছে
সবুজ খান বলেন, ‘এই পুরস্কার পেয়ে আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কিন্তু খুশিটা ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারছি না। কারণ, আমার বস সব সময় বলতেন—“তুই একটা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ডিজার্ভ করিস।” উনি যদি এই পুরস্কারটা পেতেন, আমি হয়তো আরও বেশি আনন্দিত হতাম।’