বাগেরহাটে মৎস্য আড়ত নির্মাণে ‘পুকুরচুরি’র অভিযোগ
প্রকাশ : 2026-04-28 16:12:07১ | অনলাইন সংস্করণ
নিউজ ডেস্ক
বাগেরহাট সদর উপজেলার কররী সিঅ্যান্ডবি বাজারে মৎস্য আড়ত নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই মৎস্য বিভাগ, ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা। ফলে মৎস্য ব্যবসায়ীদের উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া এই প্রকল্প থেকে সুফল পাচ্ছেন না তারা। এদিকে অনিয়মের দায় এড়াতে মৎস্য বিভাগ ও প্রকল্প কমিটি একে অপরের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।
জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধিনে “টেকসই উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন” প্রকল্পের আওতায় আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আরসিসি সড়ক, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সুবিধাসহ একটি আধুনিক মৎস্য আড়ত গড়ে তোলার কথা ছিল। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিজাইন অনুযায়ী কাজ হয়নি, অনেক অংশ অসম্পূর্ণ এবং যেখানে কাজ হয়েছে সেখানেও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে।
স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী মো. বেল্লাল হোসেন বলেন, “আমরা ভালো একটা আড়ত পাবো ভেবেছিলাম। কিন্তু শুরু থেকেই আমাদের কিছু বুঝতে দেয়া হয়নি। মৎস্য বিভাগ ও প্রকল্প কমিটির সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। এখনও তারা নানা ভাবে ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরা চাই, সঠিক ভাবে তদন্ত করা হোক।
ব্যবসায়ী একরাম হোসেন বলেন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। কাজের মান নিয়ে বারবার আপত্তি জানালেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। এখন দেখি টাকা সব টাকা তুলে নিয়েছে ঠিকাদার, কাজ শেষ করেনি।
মো. শহিদ বলেন, ড্রেন নির্মান থেকে শুরু করে এমন কোন স্থান নেই যেখানে সঠিক কাজ হয়েছে। যতটুকু কাজ হয়েছে তা দুই নম্বর ছাড়া কিছু নয়। বৃষ্টি হলে, বাইরের আগে আড়তে পড়ে। প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার কি কাজ হলো তা আমরা হিসাব মিলাতে পারছি না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি, ঠিকাদার ও মৎস্য বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে পুরো প্রকল্পে ‘হরিলুট’ হয়েছে। বিভিন্ন সময় মৎস্য বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তারা আড়ৎ পরিদর্শনে আসলেও তারা সুফলভোগীদের কোন কথায় শোনেনি।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির ভেতর থেকেই। কমিটির অর্থ সম্পাদক খান জাহিদ অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “কিছু কাজ ঠিকভাবে হয়নি, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ঠিকাদারকে যখনই বলেছি কাজ ঠিকমত করতে তখনই বলেছে করবে, করবে।”
বাজারের নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, তারা কাজ বুঝেই পাননি। প্রকল্পের নথি বা বাস্তব অগ্রগতি সম্পর্কে তাদের কিছুই জানানো হয়নি।
তবে অভিযুক্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক হেমায়েত হাওলাদার হিমুর দাবি তাকে কিছু না বলেই এই পদে বসানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, “ প্রকল্পের কাজের ঠিকাদার নিয়োগ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। সব কিছু হয়েছে সভাপতির মাধ্যমে এবং মৎস্য অফিসের সাথে যোগসাজশে।”
এই প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন, যিনি বর্তমানে বাগেরহাট সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “প্রকল্পের কাজ নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। কোথাও সমস্যা থাকলে সেটি খতিয়ে দেখা হবে।”
অন্যদিকে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) রাজ কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল স্থানীয় কমিটির। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তাদের দায় নিতে হবে।”
প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই কীভাবে বিল পরিশোধ করা হলো, এ প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মধ্যে। তারা বলছেন, দ্রæত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে দুর্নীতি আরও বাড়বে।