নির্বাচন ঘিরে উপকূল ও সমুদ্র এলাকায় নৌবাহিনীর কড়া নিরাপত্তা বলয়

প্রকাশ : 2026-02-05 12:26:40১ |  অনলাইন সংস্করণ

  নিউজ ডেস্ক   

নির্বাচন ঘিরে উপকূল ও সমুদ্র এলাকায় নৌবাহিনীর কড়া নিরাপত্তা বলয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সংবেদনশীল উপকূলীয় অঞ্চল ও সমুদ্রসীমায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। উপকূলঘেঁষা জেলা, দ্বীপ ও দুর্গম চরাঞ্চলে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে সমুদ্রপথে টহল, চেকপোস্ট, কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের জন্য ৮টি জেলার উপকূলীয় ২৩টি উপজেলা এবং ২টি সিটি করপোরেশনে প্রয়োজনীয় কন্টিনজেন্ট মোতায়েন রয়েছে। এসব এলাকায় ১৬টি সংসদীয় আসন অন্তর্ভুক্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত আছেন ৫ হাজারের বেশি নৌসদস্য।

কেন উপকূল ‘সংবেদনশীল’

নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, স্থলপথের পাশাপাশি জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না করলে উপকূলীয় অঞ্চলে নির্বাচনি নিরাপত্তা পুরোপুরি কার্যকর হয় না। নদী, সমুদ্র, খাল ও মোহনায় সমন্বিত টহল না থাকলে অনুপ্রবেশ ও নাশকতার ঝুঁকি থেকে যায়। তাদের মতে, নির্বাচনের সময় উপকূলীয় এলাকায় কয়েকটি ঝুঁকি বেশি থাকে— সমুদ্রপথে অস্ত্র বা অবৈধ ব্যক্তির অনুপ্রবেশ চোরাচালান ও মানবপাচার-চক্রের সক্রিয়তা, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জলসীমায় নিরাপত্তা ঝুঁকি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া— এসব কারণে কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, মোংলা ও সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকাকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে।

তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়

নির্বাচনি দায়িত্বে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে নৌবাহিনী। প্রথমত, যুদ্ধজাহাজ, গানবোট, প্যাট্রোল ক্রাফট ও স্পিডবোট দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সমুদ্র ও উপকূলজুড়ে টহল চলছে। সন্দেহজনক নৌযান থামিয়ে তল্লাশিও করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, দুর্গম দ্বীপ ও চরাঞ্চলের ভোটকেন্দ্রের কাছাকাছি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা যায়।

তৃতীয়ত, সহিংসতা, কেন্দ্র দখল বা নাশকতার খবর পেলেই তাৎক্ষণিক অভিযানের জন্য কুইক রেসপন্স টিম মোতায়েন রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে একজন ঊর্ধ্বতন নৌ কর্মকর্তা বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় ভোট যেন নির্বিঘ্ন হয়, সেজন্য স্থল ও জল— দুই দিকেই সমন্বিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। যেকোনও অনিয়ম বা নাশকতার চেষ্টায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি

এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে নৌবাহিনী। রাডার ও মেরিটাইম সার্ভেইল্যান্স, ড্রোন পর্যবেক্ষণ এবং কোস্টাল স্টেশন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সমুদ্রপথে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি (ভিএইচএফ) যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সন্দেহজনক চলাচল দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন এলাকায় জাহাজ ও বোট মোতায়েনের পাশাপাশি ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে বিশেষ অভিযান এবং নিয়মিত টহল ও ফুট পেট্রোলিংও চলছে। প্রয়োজনে জাহাজ, হেলিকপ্টার, কুইক রেসপন্স ফোর্স (কিউআরএফ) ও সোয়াডস টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সমন্বয়ে জোর

নির্বাচনের সময় নৌবাহিনী নির্বাচন কমিশন, কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথ কন্ট্রোল রুমে কাজ করবে। বিশেষ করে দ্বীপ ও নদীবেষ্টিত এলাকায় ব্যালট ও নির্বাচনী সরঞ্জাম পরিবহনেও নৌযান সহায়তা দেবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অতীতের নির্বাচনগুলোতে সেন্টমার্টিন, সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার মতো দুর্গম এলাকায় নৌবাহিনীর উপস্থিতি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

যা বলছেন নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা

সেন্টমার্টিনের ফরোয়ার্ড ঘাঁটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মহিউদ্দিন বলেন, “দ্বীপবাসী যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সে লক্ষ্যেই আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক আছি।”

নৌবাহিনীর সহকারী প্রধান (অপারেশন্স) রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসা বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) কুতুবদিয়া ও সন্দ্বীপ এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান বলেন, ‘‘আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বাড়িয়ে ভোটারদের জন্য ভয়মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’’ তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন।

সৌজন্যে ঃ বাংলা ট্রিবিউন