কাউনিয়ায় গরু মহিষের হাল হারিয়ে যাচ্ছে, স্থান করেছে যান্ত্রিক ট্রাকটর

প্রকাশ : 2025-02-01 18:25:37১ |  অনলাইন সংস্করণ

  নিউজ ডেস্ক   

কাউনিয়ায় গরু মহিষের হাল হারিয়ে যাচ্ছে, স্থান করেছে যান্ত্রিক ট্রাকটর

গ্রাম বাংলার চির চেনা রূপ কৃষকেরা লাঙ্গল-জোয়াল-মই কাঁধে নিয়ে কাক ডাকা ভোরে হালুয়া (চাষি) কে গরু মহিষ হাল নিয়ে জমি চাষের জন্য মাঠে যেতেন। সেই চিরচেনা দৃশ্য কাউনিয়ার গ্রাম-গঞ্জে এখন আর সচরাচর দেখা মেলে না। কালের আবর্তনে যান্ত্রিক আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার এই ঐতিহ্যটি।

সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখাগেছে, লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষ আর চোখে পড়ে না। হঃ হঃ-ডাইন-ডাইন বাও-বাও বলে গরু তারিয়ে নিতেও দেখা যায় না। যান্ত্রিকতার দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশ বান্ধব গ্রামীন ঐতিহ্য গরু মহিষের হাল। আগে গ্রাম গঞ্জে প্রতিটি গৃহস্থ পরিবারে গরু মহিষের হাল ছিল। এক গৃহস্থ আর এক গৃহস্থের কাছে হাল ধার নিয়ে গাথা করে জমি চাষ করতো। এখন সে দৃর্শ্য চোখে পড়ে না। লাঙ্গলের ফলা জমির অনেক গভীর অংশ পর্যন্ত আলগা করতো। গরুর পায়ের কারণে জমিতে কাদা হতো অনেক এবং গরুর গোবর জমিতে পড়ে জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করতো। স্বল্প সময়ে দ্রুত ট্রাকটর আর পাওয়ার টিলার দিয়ে অধিক পরিমান জমি চাষাবাদ করায় কাঠ বাঁশের লাঙ্গল এর হাল হারিয়ে যাচ্ছে। আগে দেখা যেত কাক ডাকা ভোরে কৃষক গরু, মহিষ, লাঙ্গল, জোয়াল নিয়ে ভাওয়াইয়া, জারি, সারি গান গাইতে গাইতে মাঠে বেরিয়ে পরতো। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বাণিজ্যিক ভাবে কৃষক গরু, মহিষ পালন করত হালচাষ করার জন্য। আবার অনেকে গবাদিপশু দিয়ে হালচাষকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ছিলেন। এখন আর সে দৃশ্যও চোখে পড়ে না আর গানও শোনা যায় না। গদাই গ্রামের কৃষক আলআমিন জানান গরু মহিষের দাম সহ গো খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পাশা পাশি হালের দাম কমে যাওয়ায় চাষিরা হাল গরু বিক্রয় করে দিয়েছে। এখন অল্প সময় যান্ত্রিক চাষাবাদে সময় ও অর্থ কম লাগায় কৃষকেরা আর হালের জন্য গরু-মহিষ লালন পালন করেন না। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ফলে কৃষিতে এসেছে নানা পরিবর্তন। কৃষকরা পেশা বদল করে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। হরিশ^রের কৃষক মোতালেব জানান আগের মতো গো-চারন ভুমি নেই ফলে গরু মহিষ লালন পালনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। কৃত্রিম গো খাদ্য দিয়ে গরু মহিষ পালন ব্যয়সাধ্য ও দুরহ হয়ে পড়েছে। তাই এলাকায় গরু মহিষের হাল হারিয়ে যাচ্ছে। গদাই গ্রামের কৃষক শাহজাহান মন্ডল জানান, আগের দিনের গৃহস্থ পরিবার গুলোর ঐতিহ্য ছিল গরু-মহিশের হাল। যার যত বেশী হাল ছিল সে তত বড় গৃহস্থ হিসেবে পরিচিত ছিল। হাল বিক্রয় করে অনেকে সংসার চালাত। আর হালের গরুর যে গবর হতো তা দিয়ে জমির জৈব সার হিসেবে বিক্রয় করতো আর অনেকে নিজের জমিতে দিত। বর্তমানে যান্ত্রিক যুগে কলের লাঙ্গলের কাছে সব হারিয়ে যাচ্ছে। গদাই গ্রামের কৃষক গফুর মন্ডল বলেন, ‘ছোটবেলায় হালচাষের কাজ করতাম। বাড়িতে পান্তা ভাত মরিচ পিয়াজ আর সরিষার তেল দিয়ে মেখে খেয়ে বেড়িয়ে পড়তাম লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে দিয়ে জমি চাষ করতে। এখন আধুনিক বিভিন্ন মেশিন এসেছে, সেই মেশিন দিয়ে লোকজন জমি চাষাবাদ করে। তাই গরু, মহিষ, লাঙ্গল, জোয়াল নিয়ে জমিতে হাল চাষ করা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে এখন যে দু’একটি গরু-মহিষের হাল চোখে পড়ে তারা জমি চাষের চেয়ে মই দেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকে এবং যাদের অল্প-সল্প জমি রয়েছে তারাই শুধু হাল দিয়ে চাষ করে। কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া আকতার জানান জৈব সারের চাহিদা পূরনে গরু-মহিষের হালের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। অনেকে মন্তব্য করে বলেছেন কবি নজরুলের পত্রিকা‘লাঙ্গল’ যেন হারিয়ে গেছে তেমনি আর কিছু দিন পর আমাদের নতুন প্রজন্মকে লাঙ্গল জোয়াল চেনাতে নিয়ে যেতে হবে যাদু ঘরে। কারন বিলুপ্ত জিনিষই যাদু ঘরে স্থান পায়।