ইতিহাসের নির্মম কারবালা যুদ্ধ

প্রকাশ : 2021-08-20 09:04:41১ |  অনলাইন সংস্করণ

  নিউজ ডেস্ক   

ইতিহাসের নির্মম কারবালা যুদ্ধ

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর তিরোধানের পর যথাক্রমে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ) ও হজরত আলীর (রাঃ) শাসনের পর নবীদৌহিত্র হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) খোলাফায়ে রাশেদীনের প ম খলিফা নির্বাচিত হন। হজরত আলী (রাঃ) কুফায় নিহত হলে কুফাবাসীগণ হাসান (রাঃ)কে সিংহাসনে বসান। কিন্তু ইমাম হাসান (রাঃ) মাত্র কয়েক মাস সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে খিলাফতে থাকতে পেরেছিলেন। দামেস্কের গভর্নর মুয়াবিয়া হাসানের বশ্যতা স্বীকার না করে নিজেকে আরব জাহানের খলিফা ঘোষণা করে। শুধু তাই নয় মুয়াবিয়া কুফা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। ফলে শান্তিপ্রিয় হাসান (রাঃ)কেও যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে হয়। কিন্তু তিনি মুয়াবিয়ার কূটনীতির ধ্রুমজালে পড়ে যান। এতে মুয়াবিয়া ইমাম হাসানকে তার বশ্যতা স্বীকারের আহ্বান জানায় এবং এক‌ই সাথে সন্ধির প্রস্তাবও পাঠায়। চতুর মুয়াবিয়া প্রচুর হুমকি-ধামকিসহ রক্তপাতের ভয় দেখায়। এমন পরিস্থিতিতে মুসলিম জাহানের শান্তির জন্য ইমাম হাসান (রাঃ) সন্ধির প্রস্তাবে রাজী হয়ে যান। তিনি মুয়াবিয়াকে স্বীকৃতিও প্রদান করেন। এখানে হাসান (রাঃ) শর্ত দেন যে, মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর হাসান-ভ্রাতা নবীর অপর দৌহিত্র ইমাম হোসেন রাঃ) খলিফা হবেন। ধূর্ত মুয়াবিয়া গদীর লোভে তাৎক্ষণিক রাজি হয়ে যায়। এভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খলিফা হয় চতুর মুয়াবিয়া। ভবিষ্যতে ইমাম হোসেনকে খিলাফত ছেড়ে দিতে হবে ভেবে সে অস্থির হয়ে পড়ে। তার একমাত্র চিন্তা ছিল কীভাবে নিজ উমাইয়া বংশের শাসন চিরস্থায়ী করা যায়। নিজের পুত্র ইয়াজিদকে ক্ষমতায় আনার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকে। ইয়াজিদ ছিল দুশ্চরিত্র-লম্পট, মদ্যপ ও আধার্মিক। মুয়াবিয়া নিজের পুত্রের ভবিষ্যৎ পথ নিস্কন্ট করতে পুত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হোসেনকে হত্যা করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠে। প্রথমেই লেগে যায় হাসান (রাঃ) এর পিছনে। মন্ত্রী মারোয়ানের কুপরামর্শে মায়মুনা নামে এক নারীর সহায়তায়  হাসান (রাঃ)-কে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। ইমাম হাসান (রাঃ) এর মৃত্যুর পর মুয়াবিয়ার স্বেচ্ছাচারিতা অনেক বেড়ে যায়। বিশৃঙ্খল রাজ্যে আশান্তি বাড়তেই থাকে। এদিকে মোটেও খেয়াল না করে মুয়াবিয়া ফরমান জারি করে ইয়াজিদের প্রতি বায়াতের আহবান জানায়। 

মুয়াবিয়র মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র ইয়াজিদ স্বদর্পে সিংহাসনে বসে। ক্ষমতা নিয়েই সে হোসেন (রাঃ)কে বায়াৎ গ্রহণের আহবান জানায়। কিন্তু ধর্মকর্মে নিয়োজিত ইমাম হোসেন মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে ইয়াজিদকে নিরাপদ মনে করেননি। তিনি বায়াৎ গ্রহণে আপত্তি জানান। এতে ইয়াজিদ ক্ষুব্ধ হয়ে হোসেনের বাসস্থান মদিনায় রক্তপাত করার হুমকি দিতে থাকে। পবিত্র মদিনা অসম্মানিত হবে ভেবে হোসেন (রাঃ) মক্কায় যেতে ইচ্ছে করেন। মক্কায় আসার পর‌ সেখানেও তিনি তাঁর প্রাণনাশের আশংকা করেন। এদিকে দুঃশাসনে অতিষ্ঠ কুফাবাসী ইয়াজিদের বশ্যতা অস্বীকার করে। জনগণ হোসেন(রাঃ)কে ক্ষমতায় আনার সংকল্প করে তাঁকে কুফায় আসার আমন্ত্রণ জানায়। দ্বিধাগ্রস্ত হোসেন কুফার অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য চাচাতো ভাই মুসলিমকে সেখানে পাঠান। অবস্থা অনুকুল মনে করে মুসলিম হোসেনকে কুফায় আসার সম্মতি দেন। দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ইমাম-কাফেলা ইরাকে প্রবেশ করে দেখতে পায় তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে কেউ আসেনি। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। আরও কিছু পথ অতিক্রম করে কুফার ষড়যন্ত্র বুঝতে পারেন। ইতিমধ্যে বেঈমানের দল আগে খবর নিতে আসা মুসলিমকে হত্যা করে ফেলে। বিভিন্ন মারফত ইমাম হোসেন সংবাদ পেয়ে যান তাকে নিধন করার সকল প্রস্তুতি ইয়াজিদ বাহিনী নিয়ে ফেলেছে। আর‌ও অগ্ৰসর হয়ে ইমাম কাফেলা দেখতে পায়-একটি তাবুর শীর্ষে একটি তলোয়ার ঝুলছে এবং সামনে একটি ঘোড়া দন্ডায়মান। তাবু হতে আবদুল্লাহ কুফী নামের এক স‌ওদাগর হোসেনের কাছে এসে বলে, আপনি প্রতারিত হয়েছেন। কুফাবাসী কেউ আপনার পক্ষে আসতে পারবে না। ইয়াজিদের কথায় বাধ্য হয়ে তারা আপনাকে বধ করতে এসেছে। আবদুল্লাহ হোসেন (রাঃ)কে ফিরে যেতে বার বার অনুরোধ করে। কিন্তু তিনি ফিরে যাওয়া সমীচীন মনে করলেন না। দুশ্চিন্তার মধ্যে কাফেলা এগিয়ে যাচ্ছিল। যদিও কোথায় যাবেন, কি করবেন স্থির করতে পারছিলেন না। এর‌ই মধ্যে হোর নামে একজন সেনাপতি এসে একই কথা বলে। ইমাম-কাফেলা কুফার রাস্তা ত্যাগ করে অন্য পথ ধরে। যেতে যেতে কুফা হতে চল্লিশ মাইল উত্তর-পশ্চিমে ফোরাত নদীর তীরে বিশ্রামের জন্য বিরতি নেয়। পরে তারা জানতে পারে এ স্থানের নাম কারবালা। কারবালা ময়দানেই ইমাম হোসেন (রাঃ) শিবির স্থাপন করেন। পরের দিন দিবালোকে দেখা গেল ময়দানটি জনমানবহীন ভয়াবহ একটি তরুলতা-গাছগাছালি বিহীনস খা খা প্রান্তর।

ইয়াজিদের সৈন্যরা কারবালার চারপাশ ঘিরে ফেলে । কারো বুঝতে আর বাকি থোকে যুদ্ধ অনিবার্য। ইমাম বাহিনী যতটুকু সম্ভব সুরক্ষার চেষ্টা করে। এর‌ই মধ্যে হোসেন(রাঃ)কে খবর পাঠানো হয় খিলাফতের আশা ত্যাগ করতে। যুদ্ধের হুমকি দেয়। যুদ্ধে অনেক খুন খারাবীসহ প্রচুর রক্তপাত হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়। ইয়াজিদের এমন সব আস্ফালন ও কথার উত্তরে শান্তিপ্রিয় হোসেন তিনটি প্রস্তাব দেন।,(এক) আমি যুদ্ধ করবোনা। আমাকে মদিনায় ফিরে যেতে দাও। (দুই) অথবা অন্য কোন দূর দেশে যেতে দাও। (তিন) ইয়াজিদের সাথে আমি সাক্ষাৎ করতে চাই। পাষান্ড পক্ষ হতে কোন‌ই উত্তর‌ই পাওয়া যায়নি। উপরন্তু ইয়াজিদ বাহিনী হোসেন (রাঃ)কে বায়াৎ গ্ৰহণের চাপ দেয়। হোসেন বলেন, ইয়াজিদ আমার আত্মীয় , আমি তার সাথে কথা বলে সফর সঙ্গীদের নিয়ে ফিরে যাবো। তাতে ও কোন ফল হলোনা। বর  হোসেন (রাঃ)কে বন্দি করে তাঁর পবিত্র ছিন্ন শির ইয়াজিদের সম্মুখে প্রেরণের হুকুম হয়। ইমাম হোসেন স্পষ্ট বুঝে গেলেন এখানে যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন গতি নেই। শত্রুপক্ষের নিকট ও পরিস্কার হলো ইমাম পক্ষ যুদ্ধ করবেন। তারা তাড়াতাড়ি যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ফোরাত নদীর পানির দখল নিয়ে নেয়। এতে যুদ্ধের সময় ইমাম বাহানীর পানি পাওয়ার পথ রূদ্ধ হয়ে যায়। শত্রুরা বুঝে নেয় পানি না পেলেই হোসেন পক্ষ আত্ম সমর্পন করবে। ইয়াজিদ বাহিনী ফোরাত নদীর তীর ঘিরে রাখে। ইমাম শিবিরে পানির অভাবে হাহাকার পড়ে যায়। অসম সে যুদ্ধে ইমামের সঙ্গীরা একে একে পাণ হারান। 

এলো ১০ই মহররম। ইমাম নিজেই যুদ্ধের জন্য তৈরি হন। পিতা আলীর দেওয়া তলোয়ার জুলফিকার নিয়ে দুলদুল ঘোড়ায় চড়ে তিনি কারবালার যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হন। এরপর দুলদুল ছেড়ে উটের পিঠে চড়ে শত্রুশিবিরের সামনে এসে তাদের উদ্দেশে বলেন, আমি রসুলুল্লাহর নাতি, মহাবীর আলী ও মা জননী ফাতেমার ছেলে, তোমরা যে নিজ হস্তে তাঁকে কাটতে এসেছো বিশ্বাস হয়না। আমিতো কোনো অন্যায় করিনি। তোমাদের আমন্ত্রণে এখানে এসেছি। আমাকে হত্যা করার জন্য তোমরা কেন প্রস্তুত হয়েছো? আমাকে হত্যা করো না। পথ ছাড়, আমি আল্লাহর কাবাঘরে অথবা নানাজানের র‌ওজায় বাকি জীবন কাটিয়ে দেবো। শত্রুদের কোন উত্তর না পেয়ে ইমাম আবার বলেন, আল্লাহর শোকর আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। ইমাম হোসেন (রাঃ) আকাশের পানে হাত তুলে মোনাজাত করে বলেন, ইয়া এলাহি ,আমি সংকটাপন্ন, তুমিই আমার ভরসা। মোনাজাত শেষে উট হতে নেমে তিনি পুনরায় দুলদুলে আসীন হন এবং শত্রুপক্ষের প্রথম আঘাতের প্রতীক্ষায় থাকেন। সীমারের পরামর্শে প্রথম তাদের সেনাপতি ওমর হোসেন (রাঃ) এর প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করে। উভয়পক্ষের তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হয়। শুরুতে শত্রুপক্ষ ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইমামপক্ষ হতে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহবান করা হলেও শত্রুপক্ষ রাজি না হয়ে দূর হতে তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। ইমাম পক্ষের সেনাপতি হোর উপর্যুপরি আক্রমণ ও বহু শত্রু নিধন করে নিজে শহীদ হন। একে একে সেই অসম যুদ্ধে ইমামের ২০/২২ বছর বয়সী ভ্রাতুস্পুত্র কাশিমসহ প্রায় সবাই শহাদাৎ বরণ করেন। সর্বশেষ হোসেন (রাঃ) অস্ত্র ধারণ করেন পুনরায় দুলদুলে চেপে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হন। প্রথমে তিনি ফোরাত নদীতে গেলেন। সামনে যাকে পান তাকেই দ্বিখন্ডিত করে নদীর কিনারায় উপস্থিত হন। সীমার বুঝে ফেলে পানি পান করে হোসেন শক্তিশালী হয়ে উঠলে যুদ্ধ জেতা যাবেনা। তীরন্দাজদের হুকুম দেয় হোসেনকে হত্যা করতে। পানিতে নেমে  হোসেন শীতল হতে লাগলেন, পানি পান করতে পারলেন না। মুহূর্তেই শত্রু পক্ষের নিক্ষিপ্ত তীরে তাঁর পবিত্র ওষ্ঠ বিদ্ধ করে ফেলে। রক্তের প্রবাহে হাতে নেওয়া পানি লালে লাল হয়ে যায়। অনেক কষ্টে তিনি তীরে উঠে এলেন। আবার অস্ত্র চালাতে লাগলেন। সামনে যাকে পেলেন সংহার করলেন। তা দেখে ভয়ে শত্রুরা তাঁর চারদিকে জমায়েত হতে লাগলো। সীমারের হুকুমে উপর্যুপরি তীরের আঘাতে জর্জরিত রক্ত স্রোতের মধ্যে যুদ্ধ করতে করতে ইমাম হোসেন(রাঃ)এর পবিত্র শরীর ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছিলো। আর তখন সীমার বাছাই করা কয়েকজনকে নিয়ে একত্রে তাঁর উপর আক্রমণ করলো। হোসেন আত্মরক্ষার্থে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ এক শত্রু পিছন দিকে আঘাত করে তাঁর বামহাত কেটে ফেললো। ইমাম ও প্রতিঘাতে সে শত্রুর শিরচ্ছেদ করলেন। -কিন্তু তিনি দুলদুল হতে মাটিতে পড়ে গেলেন। তার পবিত্র বক্ষস্থলে বর্শা দিয়ে আঘাত করা হলো। বর্শা বক্ষ ছিদ্র করে পিঠ দিয়ে বের হলো। এমন সময়ে নিষ্ঠুর সীমার ইমামের বক্ষের উপর চড়ে বসলো। আঘাতের পর আঘাত করে হোসেন(রাঃ)কে হত্যা করল। সংঘটিত হলো পৃথিবীর ইতিহাসের নিকৃষ্ট এক হত্যাযজ্ঞ। পাপিষ্ঠ সীমার স্বগর্বে হোসেন(রাঃ) এর ছিন্ন শির কুখ্যাত ইয়াজিদের সামনে হাজির করল। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করে এভাবেই ইমাম হোসেন(রাঃ) পরিবারসহ শাহাদাত বরণ করে অমর হয়ে রয়েছেন। 
 
লেখকঃ সাবেক শিক্ষা অফিসার।