36 C
Dhaka
Thursday, September 24, 2020
No menu items!
More

    চিন কি জিততে চলেছে?

    আবু সাঈদ লীপু
    গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের জন্য এই বছরটা শুরু হয় ভয়ঙ্কররূপে। উহান শহরে যখন শ্বাসযন্ত্রে আক্রমনকারী কোভিড-১৯ ভাইরাসের বিস্তার লাভ করে তখন চিনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের ভাবনা ছিলো এই বিষয়টা ধামাচাপা দিয়ে রাখার। বিশ্বের অনেকেই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলো, এটা চিনের জন্য ঠিক ‘চেরনোবিল’ হয়ে উঠবে। সেই সাথে চিনের পতন আসন্ন। কারণ, চেরনোবিল দূর্ঘটনার সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতার কেন্দ্র ক্রেমলিন থেকে ঠিক এরকমই মিথ্যা বলা হয়েছিলো। বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনে এই মিথ্যা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাস্তবে চিনের ক্ষেত্রে এই ভষিষ্যৎবাণী মিথ্যা প্রমানিত হচ্ছে। শুরুতে কমিউনিস্ট নেতাদের কিছু ভুল বা নৈপুন্যের অভাব ছিলো সত্যি। কিন্তু দ্রুতই তারা কাটিয়ে উঠে সীমাবদ্ধতাগুলো। উহান শহরকে অত্যন্ত কঠিন এক লকডাউনে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলে। কিছুদিন পরে দেখা যায় লকডাউন দারুণ কাজ করছে। নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে নাটকীয়ভাবে। ফলে, কল-কারাখানা আবার খুলতে শুরু করে। গবেষকরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত দ্রুত ভ্যাকসিন আবিস্কারের জন্য কাজ আরম্ভ করে। ইতোমধ্যে, চিনের অফিসিয়াল মৃতের সংখ্যা অনেকখানি ছাড়িয়ে যায় আমেরিকা, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য।

    চিন দক্ষতার সাথে এই সমস্যাকে সুযোগ হিসেবে পরিণত করে। সারা দেশে ব্যপক প্রচার করে ফেলে যে, করোনাভাইরাস দ্রুত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে শক্তিশালী একদলীয় শাসন ব্যবস্থার জন্য। এখন চিন সেই উপকার ভোগ করছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে চিকিৎসা সামগ্রী প্রদান করছে। মার্চের ১ তারিখ থেকে এপ্রিলের ৪ তারিখ পর্যন্ত শুধু মাস্কই সরবরাহ করা হয়েছে ৪০০ কোটি। চিন যে ত্যাগটুকু স্বীকার করেছে তা বিশ্বের অন্যান্য দেশকে প্রস্তুতির সময় পেতে সাহায্য করেছে। এক্ষণে, যদি কোন পশ্চিমা গণতন্ত্র ফুৎকারে চিনের একদলীয় শাসনকে উড়িয়ে দিতে চায় সেটা ভুল হবে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে যে তাদের গণতান্ত্রিক সরকার চিনের চেয়ে কতোটা দূর্বল।

    ইতোমধ্যে, কিছু পশ্চিমা পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ বলতে শুরু করেছে যে এই করোনা প্যানডেমিক থেকে সবশেষে চিনই জিততে যাচ্ছে। তাদের ভবিষ্যৎবাণী এই মহামারী শুধু মানুষের জন্যই দূর্যোগই বয়ে আনবে না, ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য ঘুরিয়ে দিবে নাটকীয়ভাবে। অবশ্য, এই ধারণার ভিত্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দৃশ্যতঃ করোনাভাইরাস বিষয়ে বিশ্ব নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। তার পূর্বসূরীরা এইডস, ইবোলা মোকাবেলায় জোড়ালো ভূমিকা রেখেছিলো সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে। অন্যদিকে, ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চিন-ঘেষা মন্তব্য করে সাহায্য দেয়া বন্ধ করেছে। এমনকি নিজের দেশেও সে বিতর্কিত হয়েছে এই বলে যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে সর্বময় ক্ষমতা তার কিন্তু তিনি কোন কিছুর জন্যই দায় নিবেন না। চিনের জন্য তাই এই সুযোগ এসেছে নিজের ক্ষমতাকে বিশ্বে প্রসারিত করার।

    তারপরও চিন সফল নাও হতে পারে। একটা কারণ হতে পারে, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় চিনের স্বঘোষিত সাফল্য কতটা সত্যি তা কোনভাবেই জানা যাবে না। যতটা সত্যি শক্তিশালী গণতন্ত্রের উপর দাঁড়ানো তাইওয়ান বা দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্য। বাইরের বিশ্ব কখনোই জানতে পারবে না যে চিনে আসলে কত সংখ্যায় আক্রান্ত হয়েছে এবং কত মারা গেছে। কোন স্বৈরাচার জোর করে কল-কারখানা খুলতে পারে। কিন্তু ভোক্তাকে বাধ্য করতে পারে না পণ্য কিনতে। সুতরাং এই ভাইরাস যত অগ্রসর হবে ততই এটা পরিস্কার হবে যে মানুষ চিনের এই রাখঢাক এবং দমননীতিকে বাহবা দিবে। নাকি উহানের সেই ডাক্তারের সর্বপ্রথম সতর্ক করার আহ্বানকে দমিয়ে রাখার জন্য দোষারোপ করবে।

    আরেকটি কারণ হলো, চিনের প্রচারণা প্রায়ই সংবেদনহীন এবং অপ্রীতিকর। চিনের মানুষজন নিছক তাদের নেতাদের প্রসংশা করে না। তাদের অনেকে আমেরিকার করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ব্যর্থতার জন্য উল্লাস করছে। এমনকি তাদের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হলো এই ভাইরাস আমেরিকার জীবানু অস্ত্র। তাদের ভাষ্য, কিছু দিন আগে গুয়াংজুতে কিছু আফ্রিকানকে তাদের বাড়ি থেকে, হোটেল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। দৃশ্যতঃ তারা রাস্তায় থাকতে বাধ্য হয়েছিলো। তার কারণ স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভয় ছিলো এরা কোন ভাইরাস আক্রান্ত। তাদের এই প্রচারণা পুরো আফ্রিকাজুড়ে পত্রিকার পাতায় নিন্দা এবং তিরস্কারের বিরাট হেডলাইন হয়।

    তৃতীয় কারণটি হলো, ধনী দেশগুলো চিনের উদ্দেশ্যকে সন্দেহের চোখে দেখে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কম্পিটিশন কমিশনার মারগ্রেথ ভেস্টাজার বলেছেন, ইউরোপের দেশগুলো কৌশলগত কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য কেনা উচিৎ। যার ফলে বাজারের এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে চিনের সহজে হঠাৎ-সুবিধা নেয়া বন্ধ করা যাবে। আরেকটু বড় করে বলা যায়, এই মহামারী বিশ্বকে যুক্তি দিয়েছে যে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য এবং সেবার জন্য, যেমন ভেন্টিলেটর থেকে ৫জি নেটওয়ার্ক, কখনই চিনের উপর নির্ভর করা উচিত নয়। এদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আশংকা করছে, করোনার ফলে বিশ্বের স্বল্পমেয়াদি ক্রয়-বিক্রয় ১৩ থেকে ৩২ শতাংশ কমে যেতে পারে। কিন্তু এটা যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, যার লক্ষণ করোনাভাইরাসের পূর্বেই শুরু হয়েছে, তা চিনের সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকর হবে।

    চিন আমেরিকার পরাশক্তিকে স্থানচ্যুত করুক এটা অন্য দেশগুলো চায় কীনা তার চেয়েও মৌলিক প্রশ্নটা হচ্ছে চিন নিজে সেটা চায় কীনা। চিনের কার্যক্রম থেকে এখনও সুস্পষ্ট যে সে আমেরিকার পেশীশক্তির মত কোন নিজস্ব অবস্থান তৈরী করার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। গুগল থেকে নেটফ্লিক্স, হার্ভার্ড থেকে গেটস ফাউন্ডেশনের মত বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তি দখলের কোন দলীয় বা ব্যক্তিগত উদ্যোগও তৈরি করছে না। এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব নেয়ার কোন ইচ্ছা দেখাচ্ছে না যাতে চিন বিশ্বের সব জায়গায় ভূমিকা নিতে পারে, যেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকা করে যাচ্ছে।

    চিনের উচ্চভিলাসের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কত দ্রুত তারা করোনা ভ্যাকসিন তৈরির দৌঁড়ে এগিয়ে যায়। যদি সর্বপ্রথম করতে পারে, এই সাফল্য চিনের জাতীয় পর্যায়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে এবং বিশ্ব-সহায়তার একটা মঞ্চ তৈরী হবে। চিনের আরেকটি পরীক্ষা হবে, গরীব দেশগুলোর ঋণ মওকুফ। এপ্রিল ১৫ তারিখে জি-২০ দেশগুলো, যেখানে চিনও আছে, গরীব দেশের ঋণ শোধ দেবার সময়সীমা আট মাস পিছিয়ে দেবার ঘোষণা দিয়েছে। অতীতে চিন ঋণজাতীয় দরকষাকষি দ্বিপাক্ষিকভাবে বদ্ধ ঘরে সম্পন্ন করেছে। ড্রাগন থেকে ইদুর জাতীয় কৌশল প্রয়োগ করে রাজনৈতিক সুবিধা নিয়েছে। এখন জি-২০ এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যদি বেইজিং সরকার ঋণ সংক্রান্ত বিষয়ে সমন্বয়ের ভূমিকা নেয় এবং উদার হয়, তবে বোঝা যাবে যে চিন অর্থ খরচ করে নতুন কোন নেতৃত্বের ভূমিকা নিচ্ছে।

    সম্ভবত চিন এখনই বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। যতদিন না অন্য পরাশক্তিগুলো ব্যর্থ হয় অথাব আর নেতৃত্ব দিতে পারবে না কিংবা চিনের নেতৃত্ব দেয়াকে রুখতে সাহস পাবে না। চিনের ইচ্ছা বিশ্বব্যাপী ডলারের ভূমিকাকে খাট করা, রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারকে পরিবর্তন করা। সেই লক্ষ্যে চিন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের কুটনৈতিকদের বসিয়ে দিচ্ছে যাতে বিশ্বনীতি প্রবর্তনে তারা নিজেদের মতামত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে মানবাধিকার, বাক স্বাধীনতা, ইন্টারনেট পরিচালনে। এই নীতির বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চিন-ঘেষা বলে সাহায্য বন্ধ করে দেয়ার আমেরিকান ঘোষণাকে। এই সিদ্ধান্ত আমেরিকার জন্য ক্ষতিকর এবং চিনের জন্য অধিকতর সুবিধার সুযোগ।

    চিনের নেতৃত্বের যুগপৎ সতর্ক এবং বিরাট উচ্চভলাস হলো ১৪০ কোটি জনসংখ্যার বিরাট দেশকে শাসন করা। তাই চিনকে একেবারে নতুন কোন আইনের-ভিত্তিতে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সংস্থার তৈরী করার প্রয়োজন নেই। বরঞ্চ দ্বিতীয় বিশ্বযদ্ধের পর থেকে আমেরিকার তৈরী বর্তমানের এলোমেলো অবস্থাকে সুসংহত করাই তার লক্ষ্য যাতে কেউ চিনের উত্থানে বাঁধা হতে না পারে।

    ব্যাপারটা নিশ্চয় এতো সহজ নয়। সবচেয়ে ভালোভাবে করোনাভাইরাস মোকাবেলা এবং এর অর্থনৈতিক পরিণতি একক নয় পুরোপুরি বৈশ্বিক। যেমন সত্য আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও। ১৯২০ সালের অবস্থা আমাদের শিখিয়েছে বৃহৎ শক্তিগুলো স্বার্থপর হলে কী পরিণতি হয় এবং অন্যের বিপদ থেকে দ্রুত সুবিধা নিতে গেলেও কী হয়। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সুবিধাবাদীদের বিরাট এক ধাক্কা দিয়ে উদার দূরদৃষ্টি সম্পন্নদের মহিমা উজ্জল করে তুলে ধরছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে সুবিধাবাদী হিসেবে অপবাদ নিয়ে নিচ্ছে। চিনও যদি সেরকম পরাশক্তিগত স্বার্থপর ব্যবহারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করে সেটা তাদের জন্য কোন বিজয় হবে না, বরঞ্চ শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।

    (দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকা থেকে অনূদিত)

    সর্বশেষ

    ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক মামুনকে অব্যাহতি, তদন্ত কমিটি গঠন

    নিউজ ডেস্ক: ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুনকে তার সংগঠন থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মামুনসহ চার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ঢাকা...

    করোনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সামনে: ডাক বিভাগের ডিজিকে সরিয়ে দিতে একমত সংসদীয় কমিটি

    নিউজ ডেস্ক: দুর্নীতির অভিযোগ ও করোনা পজিটিভ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ায় ডাক বিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) শুধাংশু শেখর ভদ্রের অপসারণ চায় সংসদীয়...

    সৌদি আরবে আকামার মেয়াদ বাড়লো আরও ২৪ দিন

    নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের কাজের অনুমতিপত্র বা আকামার মেয়াদ আরও ২৪ দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি আরব।

    নতুন কারা মহাপরিদর্শক হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর

    নিউজ ডেস্ক: নতুন কারা মহাপরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন।

    দেশের বিভিন্ন উপজেলা-ইউপি নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন যারা

    নিউজ ডেস্ক: দেশের বিভিন্ন উপজেলার উপ-নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদের উপ-নির্বাচন ও মেয়াদ শেষের নির্বাচনে চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী মনোনয়ন...